


প্রীতম দাশগুপ্ত: অসুস্থ শরীর। টাইফয়েড। তবুও থামেননি তিনি। সহযোদ্ধারা যখন মোবাইল স্ক্রিনে খবরটা দেখালেন, ইস্তফা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। মুহূর্তে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। চোখে জল। মুষ্টিবদ্ধ হাত সজোরে ঠুকলেন স্টেজে। তিনি অভিজিৎ দিপকে। ককরোচ আন্দোলনের নায়ক। যদিও খবর পাওয়া মাত্রই শান্ত হয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনো একক নায়ক নন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, ‘আমাকে নায়ক বানাবেন না। এই ভুল করবেন না।’ এই লড়াই কোনো ব্যক্তির নয়, এটি দেশের কোটি কোটি ছাত্র-ছাত্রী ও যুবসমাজের অস্তিত্বের লড়াই। যথার্থ নায়ক তো এমনই বলেন। ফলে, শনিবারের বিকালের রোদ এক নতুন ও সমষ্টিগত তরুণ শক্তিকে সসম্মানে বরণ করে নিল।
লড়াইয়ের পথ সহজ ছিল না। ৬ জুন থেকে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। পাশে বাম ছাত্র-যুব সংগঠন। সেই আন্দোলনে গতি এল গত ২৮ জুন।অনশন শুরু করলেন পরিবেশবিদ সোনাম ওয়াংচুক। নড়ে গেল গোটা দেশ। এরই মধ্যে ২০ জুলাই সংসদ অভিযানের ডাক দিল ককরোচ। কিন্তু নিজেদের মহাশক্তিমান ও অপ্রতিরোধ্য মনে করা সরকার তখন গভীর নিদ্রায়। ভাবখানা এমন, আর কিছুদিনের মধ্যেই দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা পেয়ে যাব। দেশে তেমন শক্তিশালী বিরোধী কই? রাষ্ট্রযন্ত্রের পরাক্রম রুখবে কে? অবশ্য শুধু এটুকুতেই থেমে যায়নি সরকার। মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বশংবদদের।
শুরু হয়ে যায় প্রচার। এই আন্দোলনের ফান্ডিং কে করছে? চীনের দালাল। আমেরিকার ফান্ডিং। পাকিস্তানের এজেন্ট। শোনা গেল একটা নতুন শব্দ ডিপ স্টেট। শুরু হয়ে গেল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার। দিনের পর দিন। কীসের ভিত্তিতে এই প্রচার? সরকার বলেছে? মোটেও না। বরং বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট বললেন, এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। তাহলে যাঁরা এতদিন ধরে এই প্রচার করছিলেন, তাঁরা কি ক্ষমা চাইবেন? অপপ্রচার ও মিথ্যা গুজব ছড়ানোর দায়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
নিটের প্রশ্ন ফাঁস ঘিরে সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে থামানোর অদ্ভুত সব যুক্তিও সামনে আনা হয়েছিল। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, আন্দোলনে কতজন নিট পরীক্ষার্থী আছেন? পরিবারের কেউ আছেন? বছর কয়েক আগের কথা। দিল্লিতে নৃশংসভাবে ধর্ষিতা হলেন নির্ভয়া। যমে মানুষে টানাটানির পর মৃত্যু হল তাঁর।আমাদের রাজ্যের আর জি করে ধর্ষিতা ও মৃত্যু হল চিকিৎসক অভয়ার। ভাগ্যিস সেই সময় কেউ প্রশ্ন করেনি, প্রতিবাদীদের কেউ বা নিদেনপক্ষে তাঁর বাড়ির কেউ ধর্ষিতা হয়েছেন? সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা কি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ? আমাদের ছোটোবেলায় সরস্বতী পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে শুনতাম, সরস্বতী বানান বল তো। বলতে পারলেও যা টাকা চাইতাম সেটা পেতাম না। এবার একটা নতুন ট্রেন্ড দেখলাম, নিটের ফুল ফর্ম বলতে পারবেন আন্দোলনকারীরা। ভাবখানা এমন, পৃথিবীর যত অ্যাভ্রিভিয়েশন আছে, সব ওই বিদগ্ধ ব্যক্তিদের কণ্ঠস্থ। স্বয়ং সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত বলেছেন, অন্ধ আনুগত্যের দিন শেষ। নব প্রজন্ম প্রশ্ন করছে। উত্তর চাইছে। আমাদের উচিত তাদের কাছে সবকিছু যথাযথভাবে ব্যাখা করা। কিন্তু ভক্তকূল বুঝলে তো।
আসলে আন্দোলনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেখে পালটা প্রচার ছাড়া গতি ছিল না। কীভাবে একে ম্যালাইন করা যায়। আন্দোলনে গান কেন গাইছে? কেউ নাচছে কেন? এরা হাসছে কেন? ওদের পোশাক ঠিক আছে? একটা আন্দোলন গণ আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছে। সঙ্গত কারণেই হয়েছে। কারণ মানুষ নানাবিধ সংকটে হাঁপিয়ে উঠেছিল। ঘরে ঘরে বেকার ছেলে-মেয়ে। দামের ঝাঁজে হেঁশেল সামলাতে নাভিশ্বাস উঠছে। সংসার চালাতে না পারার এই যন্ত্রণা আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই আন্দোলন। মানুষ এতদিনে প্রতিবাদের একটা মঞ্চ পেয়েই তা কাজে লাগাতে তৎপর হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না আন্না হাজারের আন্দোলনের কথা। এবারও আন্দোলনে শামিল হয়েছেন, নানা ভাষা, ধর্ম, বর্ণের শিক্ষিত, অশিক্ষিত, বড়লোক, গরিব, মধ্যবিত্ত মানুষ। প্রত্যেকের নিজস্ব দর্শন আছে, নিজস্ব ক্ষোভ আছে, চাওয়া-পাওয়া আছে। কিন্তু একটা জায়গাতেই সকলের মিল। তাঁরা এসেছেন ছাত্রদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে। আর ভাষা? জেন জির ভাষাটা এমনই। তাই আপনার যেটা অশ্লীল লাগছে, সেটা ওদের কাছে নর্মাল। তাই নিজেকে পালটে নিন। নাহলে আপনিই আশাহত হবেন। ওদের কিছু যায় আসবে না। ওরা ওদেরটা ঠিক বুঝে নেবে। জানুন, জেন জি রুখে দাঁড়াতে শেখায়। পালায় না। আপনার ভালো লাগছে না। ঠিক আছে। তার জন্য বলতে হবে, এটা আন্দোলন নয়, নাচা-গানা। আমার এক বন্ধু জয়দেব মেলায় যায়। সেখানে বাউল গান শোনে আর ওদের সঙ্গে গাঁজা খায়। আরও অনেকেই যায়। তাহলে কি বলব, ওটা গাঁজা খাওয়ার মেলা? আরে বাবা ওখানে যেমন আবেগ আছে, এই আন্দোলনেও আছে। সেটা তো বুঝতে হবে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মূল ধারার সংবাদমাধ্যমকে লঘু করা চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। তাঁকে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। সবটাই তাঁর মন কি বাতের মতো ওয়ান ওয়ে সিস্টেম। নিজের ১৪ বছরের সময়কালে সমাজমাধ্যমকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মোদি। ভেবেছেন ট্রেইনড ট্রোলবাহিনী রয়েছে। অতএব চিন্তা নেই। কারণ সেখানে কেউ মোদিকে নিয়ে প্রশ্ন করলেই ধেয়ে আসবে তির। আপনি দালাল। আপনার ধর্ম পরিচয় কী? আপনি দেশদ্রোহী। তাতেও দমানো না গেলে পুলিশ দিয়ে আটক। কিন্তু এই প্রথমবার সেই সর্বশক্তিমান নরেন্দ্র মোদিও কেঁপে উঠেছেন। সৌজন্যে সেই সমাজমাধ্যমই। ১৬ মে অভিজিৎ দিপকের একটা ছয় শব্দের পোস্ট—‘ হোয়াট ইফ অল ককরোচেস কাম টুগেদার?’ আরশোলার উত্থানে মোদির অস্ত্র হঠাৎ ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। এতটাই ভীত হয়ে পড়েছিলেন মোদি যে রাতে সমাজমাধ্যমে আসতে হয়েছে তাঁকে। দিতে হয়েছে বার্তা। মন্ত্রীদের বলেছেন, ইনস্টাগ্রামে যান, রিল বানান। কিন্তু তাও মুখ রক্ষা করা গেল না। দিপকে ঠিকই বলেছেন, যদি মানুষ ভয় না পায় এবং সরকারের সামনে মাথা নত না করে, তাহলে যে কারও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। গণতন্ত্রে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
একটা মিথ তৈরি হয়েছিল— মোদি সরকারে কোনো মন্ত্রী চাপের মুখে ইস্তফা দেন না। বরং রক্ষণাত্মক না হয়ে তারা আক্রমণাত্মক কৌশল নেয়। সিজেপির নেতৃত্বাধীন লাগাতার আন্দোলন এবং দেশজোড়া প্রতিবাদের মুখে সেই মিথ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আসলে সরকার বুঝতে পেরেছে জেদ বা ইগো নিয়ে চললে সামনে সমূহ বিপদ। কারণ সরকারের মন্ত্রীরা দৌত্য করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ। ওয়াংচুক অনশন তুললেও আন্দোলন বন্ধ হয়নি। বিজেপি প্রচারের অভিমুখ ঘোরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ। দিল্লি পুলিশ দমন-পীড়ন চালিয়েও কিছু করতে পারেনি। তাই শেষে আসরে নেমেছেন স্বয়ং মোদি। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। বরং ক্রমেই অভিমুখটা তাঁর দিকেই ঘুরতে শুরু করেছিল। তাই জনরোষের আগুনে শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলি দিতেই হল।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ কেবল একজন মন্ত্রীর বিদায় নয়। এটি ভারতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে এক নতুন সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন, দেশের ছাত্র-যুব শক্তির সম্মিলিত এবং আপসহীন আন্দোলনের সামনে বৃহৎ শক্তিকেও শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতে হয়। নিট কেলেঙ্কারি ও তরুণ প্রজন্মের এই ঐতিহাসিক লড়াই মোদির ভাবমূর্তিতে বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে এবং নির্বাচনগুলিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়া অনিবার্য।