


ক্রমশ দামি হচ্ছে চিকিৎসা পরিষেবা। ইতিমধ্যেই বেরিয়ে গিয়েছে মধ্যবিত্তেরও সাধ্যের বাইরে। গরিব এবং নিম্নবিত্ত মানুষের সমস্যাটি সহজেই অনুমেয়। স্বভাবতই সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে। কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসাবে ভারত এই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মতে, সাধারণ চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়টি রাজ্য তালিকাভুক্ত হলেও কেন্দ্রেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। কারণ চিকিৎসা পেশা ও শিক্ষা যুগ্ম-তালিকার অন্তর্ভুক্ত। যেমন পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে কল্যাণী এইমস। এই কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেন্দ্র কিছু পরিষেবা দিয়ে থাকে। সেখানে রোগীর বাড়ির লোকজনের ব্যবহারের জন্য একটি বিশ্রামগৃহ নির্মাণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যথেষ্ট সস্তায় ওই ভবনে বিশ্রাম নেওয়া যাবে। সেটি নির্মিত হবে ২৮ হাজার বর্গফুট সরকারি জমির উপরে। এটি নিঃসন্দেহে একটি জনস্বার্থবাহী উদ্যোগ। যেকোনো জনস্বার্থবাহী সরকারি প্রকল্প পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গেই রূপায়ণ হওয়া জরুরি। কারণ এজন্য যে টাকা বা সম্পদ ব্যয় করা হয় তা নাগরিকের মেহনতে অর্জিত। জনগণের অর্থ বা সম্পদের (যেকোনো ফর্মে) ব্যবহারে অনিয়ম বেনিয়ম কখনোই কাম্য নয়। তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, বিতর্ক সৃষ্টি হবে, দুর্নীতি বলেও চিহ্নিত হতে পারে।
এইমসের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অবশ্যই সরকারি নিয়ম নীতি রয়েছে। সেই নিয়মের লঙ্ঘন প্রতিষ্ঠান পরিচালন কর্তৃপক্ষের তরফে উপেক্ষা করার কথা নয়। যদি তাঁরা সেটা করেন তবে তার পিছনে নিশ্চয় কোনো লুকোনো কারণ আছে বলে ধরে নিতে হবে। শুধু ধরে নিলেই হবে না, সেই কারণ খুঁজে বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই দস্তুর। এইমস কল্যাণীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিশ্রামগৃহ নির্মাণের সরকারি জমি একটি বেসরকারি সংস্থার হাতে বিনা টেন্ডারে তুলে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি মোদি-শাহের রাজ্য গুজরাতের। কোম্পানি আইনের ৮ ধারায় তারা অলাভজনক সংস্থা হিসাবে নথিভুক্ত। কিন্তু এমন ‘যোগ্যতা’য় কেউ সরকারি জমি বিনা টেন্ডারে পেতে পারে না। স্বভাবতই তুমুল শোরগোল পড়ে গিয়েছে। আমেদাবাদের ওই বেসরকারি সংস্থাটিকে আরও সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে যে—একাধিক তলবিশিষ্ট ওই বিশ্রামগৃহ আগামী ২৫ বছরের জন্য রক্ষণাবেক্ষণও করবে তারা! এমনকি দেশের আরও চারটি এইমসে (দেওঘর, ভোপাল, দিল্লি এবং নাগপুর) আমেদাবাদের ওই সংস্থাটির কয়েকবছরের জন্য অবারিত দ্বার। আমেদাবাদের একটি সিভিল হাসপাতালে এবং পিজিআই চণ্ডীগড়েও তারা ‘সেবার’ সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। এমনকি মুম্বই, পুনে, নাগপুর সহ ছয় জায়গায় বিভিন্ন হাসপাতালে বিশ্রামগৃহ নির্মাণের জন্য মহারাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে সংস্থাটি। সেই চুক্তিতে ৪৯ বছরের জন্য তাদের কাজের বরাত মঞ্জুরির উল্লেখ রয়েছে। আর এখানেই প্রশ্ন, এসব কোন জাদুমন্ত্রবলে? এইমস কল্যাণীর ডাক্তার এবং কর্মীদের আশঙ্কা, গুচ্ছ অনিয়মের পিছনে কেন্দ্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী কোনো মস্তিষ্ক নিশ্চয় সক্রিয়। তাদের সুপারিশেই ‘ঢেঁকি’ গিলতে বাধ্য হয়েছে এইমস কল্যাণী। এমাসের প্রথমার্ধে ‘গুজরাত সরকারের স্ট্যাম্প পেপারে’ ওই সংস্থার সঙ্গে এইমস কল্যাণী চুক্তিও করে বসে আছে। বিশ্রামগৃহের ডিজাইন থেকে নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ থেকে নিরাপত্তা, খরচ-আদায় সবটাই করবে ওই বেসরকারি সংস্থা। এই চুক্তি সম্পাদিত হল টানা ২৫ বছরের জন্য। প্রয়োজনে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধিও সম্ভব। এই চুক্তির একটি বিস্ময়কর দিক হল, যে-রাজ্যে (এখানে পশ্চিমবঙ্গ) প্রকল্পটি রূপায়িত হবে, সেখানকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির ছাড়পত্র গ্রহণের উল্লেখ নেই!
সব মিলিয়ে এই কারবারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপর্যুপরি ঘোষণার কোনো মিল নেই। ‘স্বচ্ছ ভারত’ নির্মাণের খোয়াব দেখান তিনি। বিরোধীদের নিশানা করে অহরহ শোনান, ‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’। কিন্তু এইমস কল্যাণীর এই ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর সদর্প ঘোষণার বিপরীত বইকি! এত বড়ো বেনিয়ম, অবাঞ্ছিত অস্বচ্ছ কাণ্ড কীভাবে ঘটল—অবিলম্বে তা অনুসন্ধান করে দেখা হোক। সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিশ্রামগৃহ নির্মাণ প্রকল্প অবশ্যই করতে হবে। তবে তার জন্য নিয়মমাফিক টেন্ডার ডাকুক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। বিনা টেন্ডারে সরকারি প্রকল্প নির্মাণের নেপথ্যে যারা, দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নিতে হবে। কোনো রাঘব বোয়াল বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দেখে যেন হাত কেঁপে না ওঠে অনুসন্ধানী পালোয়ানদের। তা হলে এই অনাচার বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে এতে গতিসঞ্চার হবে।