


ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে দলত্যাগ ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-এ যোগ দেওয়া ২০ জন সাংসদের সদস্যপদ নিয়ে যে নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা দেশের সংবিধান ও সংসদীয় রীতির মৌলিক ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট নোটিস জারির পরপরই লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার পক্ষ থেকে পদ খারিজের কারণ জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানোর ঘটনাটি বিদ্রোহী সাংসদদের উপর আইনি চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংবিধানের দশম তপশিল বা ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ অনুসারে, কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি দলীয় হুইপ অমান্য করেন বা স্বেচ্ছায় দল ত্যাগ করেন, তবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে আইনি বিধানের মূল শর্ত হল—যদি কোনো দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে নতুন দল গঠন করেন বা অন্য দলে যোগ দেন, তবে তাঁদের প্রাথমিক সুরক্ষা মেলে। এনসিপিআই-এর বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি, ২৮ জন তৃণমূল লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন—অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য একযোগে এক পাতায় স্বাক্ষর করে স্পিকারের কাছে জমা দিয়েছেন। ফলে নিয়ম মেনেই তাঁরা দলত্যাগ করেছেন এবং এই কারণে স্পিকারের চিঠির জবাব দিতে তাঁদের কোনো আইনি অসুবিধা নেই। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এতটা সরল নয়। মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের পালটা অভিযোগ, নির্দিষ্ট দলীয় প্রতীক, ইশতেহার এবং ভোটারের রায়ে নির্বাচিত হয়ে সংসদে গিয়ে এমন এক নতুন রাজনৈতিক সত্তায় আত্মপ্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি, যার কোনো স্বাধীন নির্বাচনি অস্তিত্ব নেই। বিশিষ্ট আইনজীবীদের একাংশের মতে, প্রতীক ও দলীয় সত্তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল গাণিতিক অনুপাতের সুযোগ নিয়ে নতুন দল তৈরি করা সংসদীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী। প্রাক্তন আইনমন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবীদের যুক্তি, জনগণ যেভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পতাকার অধীনে প্রতিনিধি নির্বাচন করেছেন, সেই রায়কে মধ্যপথে পদদলিত করা ভোটারদের সঙ্গে চরম অসংবেদনশীল আচরণ।
এই আইনি ও কৌশলগত জটিলতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে স্পিকারের দপ্তর এবং রাজনৈতিক সমীকরণ। কালীঘাট তৃণমূলের অভিযোগ, গত ১৯ জুন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলত্যাগ বিরোধী আইনে ওই ২০ জন সাংসদের পদ খারিজের পিটিশন জমা দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে জবাব তলব করতেই তড়িঘড়ি স্পিকারের অফিস থেকেও সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে নোটিস পাঠানো হল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের কড়া নজরদারির কারণেই সংসদীয় সচিবালয়কে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার দিকে এগতে হচ্ছে। অনেকেই বিষয়টিকে ‘কভার-আপ’ হিসাবেও দেখছেন। অন্যদিকে, বিদ্রোহী সাংসদেরা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন শাসকদল বিজেপির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় রক্ষাকবচ খোঁজার জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেছেন। কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেলের সঙ্গে পরামর্শ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার—এই সংকট শুধু আইনি নয়, গভীর রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে আবৃত। শাসক শিবিরের আশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতেই স্বতন্ত্র সংসদীয় দল হিসাবে স্বীকৃতি মিলবে এনসিপিআই-এর। তবে বিরোধী শিবিরের চ্যালেঞ্জ, পদ খারিজ হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা এবং এর পরিণতিতে দ্রুত রাজ্যে একাধিক আসনে উপনির্বাচন ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দলীয় কোন্দল এবং দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দের কৌশল—এই সবের ঘোলাজলে আখেরে প্রশ্নের মুখে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক রায়। যদি আইনকে শুধুমাত্র ক্ষমতার সুবিধার্থে বা আইনি ফাঁকফোকর খোঁজার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তবে ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হতে বাধ্য। লোকসভার স্পিকারের নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তই এখন দেখার বিষয়—তিনি কি সংবিধানের মূল চেতনা ও রাজনৈতিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন, নাকি ক্ষমতার রাজনীতির কাছে সংসদীয় আইন আবারও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হবে?