


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: ক্ষমতার অলিন্দে থাকলে সরকারি কোষাগারকে কীভাবে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে নেওয়া যায়, বীরভূমের দুবরাজপুর পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ড তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। অভিযোগ, বছর দুয়েক আগে সাংসদ শতাব্দী রায়ের তহবিল এবং পুরসভার প্রায় ৩৯ লক্ষ সরকারি টাকা খরচ করে সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছিল একটি ‘অনুষ্ঠান ভবন’। কিন্তু সেটিই সুকৌশলে হয়ে উঠেছিল শাসকদলের ‘পার্টি অফিস’। যদিও রাজ্যে পালাবদল হতেই সেই পার্টি অফিস দখলদারি মুক্ত করল দুবরাজপুর পুরসভা। ভবনের গায়ে পড়েছে গেরুয়া-সাদা রঙের প্রলেপ, আর নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘পূর্বায়ন’।
জানা গিয়েছে, দুবরাজপুর শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য পদত্যাগী কাউন্সিলার তথা শহর যুব তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সাগর কুণ্ডু ছিলেন এই গোটা জালিয়াতি চক্রের মূল কান্ডারি। সাংসদ শতাব্দী রায়ের তহবিল থেকে ১০ লক্ষ টাকা এবং পুরসভার পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের ২৯ লক্ষ টাকা, সব মিলিয়ে মোট ৩৯ লক্ষ টাকা ঢালা হয়েছিল এই ভবন নির্মাণে। অর্থাৎ পুরোটাই সরকারি অর্থ। কিন্তু ক্ষমতার বলে সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরেই ঘটা করে এই বেআইনি কার্যালয়ের উদ্বোধনও করেছিলেন তৎকালীন পুরপ্রধান পীযূষ পান্ডে। ছিলেন অন্যান্য পুর প্রতিনিধিরাও।
জানা যাচ্ছে, জালিয়াতির জাল পাতা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। যে জমিটির ওপর এই নির্মাণ দাঁড়িয়ে, সেটি আসলে দুবরাজপুর শহর যুব তৃণমূলের নামে সাগরবাবু নিজের দায়িত্বে কিনেছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি টাকা সেখানে দেদার নয়ছয় করার উদ্দেশ্যে একটি স্ট্যাম্প পেপারে দায়সারা ‘লেখালিখি’ করে দেখানো হয় যে, জমির একটি অংশ থাকবে পার্টি অফিস আর অন্য অংশটি দেওয়া হচ্ছে পুরসভাকে। এই আইনি ফাঁকফোকর তৈরি করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পুরোপুরি জনগণের টাকায় সেখানে গড়ে ওঠে নেতার দলীয় কার্যালয়।
ঠিকাদার বিকাশ মণ্ডলের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি, পুরসভার তৎকালীন শীর্ষ কর্তাদের নির্দেশে সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাজকীয় খরচে এই ভবন বানানো হয়েছিল। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামের টাইলস ব্যবহার করা হয়েছিল নেতার ‘আরাম’ নিশ্চিত করতে। আশ্চর্যের বিষয়, কাজ শেষ হলেও ঠিকাদার আজ পর্যন্ত তাঁর ন্যায্য পাওনা পাননি। বিকাশবাবু বলেন, সাংসদ তহবিলের ১০ লক্ষ টাকা পেয়েছি, কিন্তু এখনও প্রায় ২৯ লক্ষ টাকা বকেয়া রয়েছে। সম্প্রতি, তৎকালীন পুরপ্রধান সহ বাকিরা ইস্তফা দিয়ে বেপাত্তা। পুরসভায় বসেছে প্রশাসক। তাই ঠিকাদার এখন অথৈ জলে। উপরন্তু, ক্ষমতা বদলের পর পুরসভার চাপে তাঁকেই আবার গাঁটের কড়ি খরচ করে নতুন করে রং করতে হয়েছে।
ভোটে এলাকায় তৃণমূলের পরাজয় ঘটতেই বেগতিক বুঝে সাগর কুণ্ডু ভবনটির ওপর থেকে দলীয় নিশান মুছে রাতারাতি ‘যুব সংঘ’ নাম দিয়ে সেটিকে ক্লাব হিসেবে হাতিয়ে নেওয়ার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই চালাকি ধোপে টেকেনি। প্রশাসক বসতেই পুরসভা ভবনটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। ভবনটির নতুন নামকরণ করে সরকারি নিয়ম মেনে তা সাধারণের ভাড়া নেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
এই কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে অভিযুক্ত সাংসদ শতাব্দী ঘনিষ্ঠ সাগর কুণ্ডুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি থতমত খেয়ে ফোন কেটে দেন। অন্যদিকে প্রাক্তন পুরপ্রধান পীযূষ পান্ডে ফোন তোলেননি। প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত হবে। বিজেপি নেতা দেবজ্যোতি সিংহের দাবি, সরকারি টাকা নয়ছয় করে তৃণমূলের দখলদারির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি চাই। -নিজস্ব চিত্র