


শিল্পের মাধ্যমে কথা বলার কায়দাটা কি আপনার জানা? মনের ভাব প্রকাশে ভাষার বদলে ছবির ব্যবহার করতে ভালোবাসেন? তাহলে গ্রাফিক ডিজাইনিং পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবতেই পারেন। এই বিষয়ে একটি বেসরকারি গ্রাফিক ডিজাইনিং সংস্থার অন্যতম শিক্ষিকা সুকন্যা সেনগুপ্ত বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য বা পরবর্তীতে তা পেশা হিসেবে নেওয়ার জন্য যে আঁকার হাত খুব ভালো হতে হবে এমন নয়। যেটা দরকার তা হল একটু অন্যরকম ভাবনা। ধরুন কোথাও কোনও গল্পর জন্য একটা আত্মহত্যার দৃশ্য বোঝাতে গিয়ে রক্তপাতের বদলে একটা বহুতল, ব্যস্ত রাস্তা, পড়ে থাকা দেহ ইত্যাদি আঁকলেন। একটু অন্যভাবে বোঝানো হল বিষয়টা।’ এই ভিন্নধারায় ভাবার ক্ষমতাটাই গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের ইউএসপি বা বিশেষত্ব। যে যত অন্যভাবে ভাবতে পারবে গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ে তার ভবিষ্যৎ ততই ভালো।
তৈরি হবেন কীভাবে?
এই পেশায় আসতে চাইলে প্রশিক্ষণ নিতে হবে ফোটোশপ, ইনডিজাইন, ইলাসট্রেটর, কোরেল ড্র ইত্যাদি সফটওয়্যারে। তাহলে ভিস্যুয়াল কনটেন্ট এডিট করা সহজ হবে। এই সফটওয়্যারগুলো ক্লাস করে শেখা সম্ভব। এছাড়াও কিছু বিষয়ে সহজাত জ্ঞান এবং ধারণা থাকা চাই। রং সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান থাকা জরুরি, কোন রং কী ধরনের বিষয়ের সঙ্গে মানানসই সেটা জানতে হবে। কোন রং কতটা পরিমাণে ব্যবহার করলে ডিজাইনটা দৃষ্টিনন্দন হবে সে বিষয়ে ধারণা থাকাও খুবই জরুরি। রঙের ব্যবহার করার সময় সেটা সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা দেখে বুঝতে হবে।
এছাড়াও চাই ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান। ক্লায়েন্ট একটা কনসেপ্ট পাঠাবে। তা থেকে আপনাকে একটা ভিস্যুয়াল তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ ভাষার বদলে ছবি, ভিডিও ইত্যাদির ব্যবহার করে জিনিসটা দর্শকের কাছে বোধগম্য করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তা আকর্ষণীয়ও করতে হবে। ফলে ভাষাটা পড়ে বিষয় সম্পর্কে খুব স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে পারা দরকার। যদি কনসেপ্ট বোঝায় এতটুকুও গলদ থাকে তাহলে গ্রাফিক ডিজাইন ভালো হবে না। অতএব কনসেপ্টটা বোঝা দরকার। অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান বা অন্তত আগ্রহ থাকা দরকার।
যে কোনও বিষয় নিয়ে গল্প বলার কায়দা জানা চাই। একটা কনসেপ্টকে কীভাবে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা যায় তা না জানলে এই কাজে সাফল্য আসবে না। সহজে বিষয়টাকে বোঝাতে হবে এবং যে দেখছে তার আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। ফলে বিষয় সম্পর্কে নিজের জ্ঞান ভালো হওয়া চাই। নাহলে তা সহজে বলা বা অন্যের কাছে আগ্রহের করে তোলা কিছুই সম্ভব নয়। এর জন্য প্রচুর পড়াশোনা করা প্রয়োজন।
ডেটলাইন মাথায় রাখুন
এই কাজগুলো সাধারণত একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করে ফেলতে হয়। ফলে টাইম ম্যানেজমেন্ট এক্ষেত্রে খুবই জরুরি। কাজের একটা শিডিউল ছকে নিতে হবে। সেই মতো রুটিন বানাতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। টিমওয়ার্কও এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে যেমন কাজ সহজে করা যায়, তেমনই মতের আদানপ্রদানের মাধ্যমে কাজটা খুব উন্নত পর্যায়ে পৌঁছয়।
এছাড়াও কোনও কনসেপ্ট নিয়ে ভিস্যুয়াল ডিজাইন তৈরি করার পর ক্লায়েন্ট যদি কিছু বদল চায় বা আরও কিছু প্রয়োজন মনে করে তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে করে দিতে হয়। ফলে খোলা মনে কাজ করতে হয়। কোনও বদ্ধমূল ধারণায় নিজেকে আবদ্ধ রাখলে এক্ষেত্রে চলবে না। নিজের কাজ ভাঙা, নতুন করে করা, আরও অন্য কনসেপ্ট তাতে ঢোকানো, এগুলো সব করার মতো মানসিকতা থাকা চাই। অনেক সময় গ্রাফিক ডিজাইনার নিজে খুব একরোখা বা রিজিড হয়ে যান বলে কাজের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব হারিয়ে যায়। তা যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। একটা কনসেপ্ট বা ধারণা নিয়ে নাড়াচাড়া করা, সে বিষয়ে ভাবতে ভাবতে এক কনসেপ্ট থেকে অন্য কনসেপ্ট তৈরি করা এগুলো সবই গ্রাফিক ডিজাইনারকে
করতে হয়।
কাজের সুযোগ
গ্রাফিক ডিজাইনিং পেশা হিসেবে নেওয়ার পর নিজস্বভাবে কাজ করার প্রচুর সুযোগ থাকে। পত্রপত্রিকার হয়ে কাজ করা যায়, কর্পোরেট কোম্পানির সঙ্গে কাজ করা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ব্রোশিওর বানানোর কাজ করা যায়, হোটেল, রেস্তরাঁর মতো হসপিটালিটি সেক্টরে কাজ করা যায়, এছাড়াও হাসপাতাল ইত্যাদিতেও কাজের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রথম থেকেই ফ্রিলান্সিং না করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চাকরি করার পর নিজের মতো কাজ করাই ভালো। তাতে অভিজ্ঞতা হবে এবং লোকের ভরসাও বাড়বে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র, ডিজিটাল মিডিয়া, ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন। নিজের কাজের একটা পোর্টফোলিও বানান। সেই অনুযায়ী কাজের আবেদন করুন। আপনার দক্ষতা কোন দিকে বেশি সেটাও নির্দিষ্ট করে বুঝে নিন। সেই অনুযায়ী কাজের দরখাস্ত করুন।
এআই-এর সঙ্গে
সুকন্যা বললেন, ‘আজকাল এআই-এর যুগ অনেকেই চিন্তিত, ভাবছেন সংস্থাগুলো সহজেই তাঁদের কাজটা যন্ত্রের মাধ্যমে করিয়ে নিতে পারবেন। এই নিয়ে একটা গেল গেল রবও উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা যাতে না হয় সেই মতো নিজেকে তৈরি করতে হবে।’ তার জন্য কীভাবে এগবেন? সুকন্যা বললেন, এআইকে বন্ধু হিসেবে নিয়ে কাজ করুন। সেই ধারণাগুলো খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করুন। তারপর তাকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন মস্তিষ্কের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এআই-এর পক্ষে অসম্ভব। ফলে এআই-কে সঙ্গে নিয়ে চলুন। সেই ধারণাগুলোর উপর নিজের ধারণাগুলো চাপিয়ে একেবারে ভিন্ন কিছু তৈরি করুন।
কমলিনী চক্রবর্তী