


দুর্বাদল চন্দ্র, ঝালদা: ‘আমি কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে ডাকি, আমি কৃষ্ণের কি রূপ জানি না। ও আমার সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টি করে আমায় চক্ষু দুটো দিলে না...।’—মাপা গলা। ভরাট সুর। পুরুলিয়ার বাসুডি গ্রামে ঢুকলেই দূর থেকেই ভেসে আসে এই গান। উৎস সন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, এক চিলতে কাঁচা বাড়ি। উঠোনে খাটিয়া পাতা। তার উপর বসে কিবোর্ড বাজিয়ে গানের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নালিশ ঢুকছেন এক দৃষ্টিহীন যুবক। ভোরের নীরবতা ভাঙে তাঁর কণ্ঠস্বরে। ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। তাঁর জীবন-যুদ্ধের গীত মুগ্ধ হয়ে শোনেন অনেকেই। শুনতে শুনতে বলেন, ‘ঈশ্বর দৃষ্টিশক্তি না দিলেও কণ্ঠ দিয়েছেন। সেই কণ্ঠে বাস সাক্ষাৎ সরস্বতীর।’
বাসুডি গ্রামটি বাঘমুন্ডি ব্লকের অন্তর্গত। বাঘমুন্ডি থেকে কয়েক কিমি গেলেই কৃপাসিন্ধু রায়ের ওই কাঁচা বাড়ি। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। ছেলেবেলায় পড়াশোনার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে গানের প্রতি ছিল অদ্ভুত টান। মা ক’ বছর আগে মারা গিয়েছেন। এখন বৃদ্ধ বাবা অজিত রায় ও দাদা নিরঞ্জন রায়ের সঙ্গেই তাঁর একাকি সংসার। দাদা ইলেকট্রিকের সরঞ্জাম মেরামতের কাজ করেন। বাবা চাষাবাদ করেন। সামান্য আয়েই চলে তিনজনের পরিবার।
গান থামিয়ে কৃপাসিন্ধু আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘প্রকৃতির সুন্দর রূপ আমি দেখতে পাই না। লোকের মুখে শুনি—দিগন্তজোড়া সবুজ, আকাশে তুলোর মতো পেঁজা মেঘ। কখনও শুনি মেঘলা আকাশ। বৃষ্টি গায়ে পড়লে বুঝতে পারি। আর বুঝতে পারি আমার কণ্ঠস্বরকে। ছোটবেলা থেকেই তাই গানই আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন।’ প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সব মানুষই একরকম প্রতিবন্ধী। আমি হয়তো ভালো গান করি। কিন্তু অন্য কিছু করতে পারি না।’ কৃপাসিন্ধুও একদিকে প্রতিবন্ধী। কিন্তু, সঙ্গীত জীবনে তিনি সক্ষম। হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, ব্যাঞ্জো, তবলা ও নাল—একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে ওস্তাদ কৃপাসিন্ধু।
সম্প্রতি পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতিকে ঘিরে কৃপাসিন্ধু একটি গান গেয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেটি রকেট গতিতে ভাইরালও হয়। পেয়েছেন বহু মানুষের ভালোবাসা। কৃপাসিন্ধুর কথায়, ‘শ্রীকৃষ্ণ আমাকে চোখ দেননি। কিন্তু কণ্ঠে গান দিয়েছেন। সেই গান নিয়েই আমার বেঁচে থাকা। বাউল ও ঝুমুর গান গাইতে আমার বেশি ভালো লাগে।’
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন ছৌ নৃত্যদলের সঙ্গে যুক্ত কৃপাসিন্ধু। সেখানে তিনি গান গাওয়ার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রও বাজান। দাদা নিরঞ্জন রায় বলেন, ‘ঈশ্বর ওকে অসাধারণ গলা দিয়েছেন। কোনো গান একবার শুনলেই কিবোর্ড বা হারমোনিয়ামে তুলে ফেলতে পারে। ওর এই প্রতিভার আরও বিকাশ হোক। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে এটাই আমার প্রার্থনা।’ একসময় সরকারি শিল্পী ভাতা পেতেন কৃপাসিন্ধু। এখন সেই ভাতা বন্ধ। পরিবারের আবেদন, প্রশাসন কৃপাসিন্ধুর পাশে দাঁড়ালে ভালো হয়।
দু’চোখে দেখি না তবু, তুমি আছো...। শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় কৃপাসিন্ধুর কণ্ঠ অন্তত সেটাই প্রমাণ করে।