


নিজস্ব প্রতিনিধি, মালদহ ও সংবাদদাতা, হবিবপুর: এখানে দেবী লক্ষ্মী দ্বিভুজা নন, অষ্টাদশভুজা। সম্পদের দেবী এখানে ধানের ঝাঁপি নিয়ে নন, রণসাজে সজ্জিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণে চণ্ডীর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত, মা দুর্গা যেমন দশভুজা হয়ে মহিষাসুর বধ করেছিলেন, তেমনই অষ্টাদশভুজা হয়ে মহালক্ষ্মী রূপে তিনি পরাস্ত করেন অসুরকুলকে। দুর্গার এই মহালক্ষ্মী রূপেরই পুজো হয়ে থাকে বামনগোলার গাঙ্গুরিয়া শ্রীশ্রী সারদা তীর্থম আশ্রমে। তবে আজ, রবিবার সকালে অষ্টাদশভুজা শক্তি রূপে পূজিতা হলেও সন্ধ্যায় কোজাগরি রূপে একই মণ্ডপে পুজো পাবেন দেবী।
শনিবার রাতেই চলে এসেছে প্রতিমা। যাঁর হাতে ত্রিশূল, চক্র, গদা, ফলা, পদ্ম, শঙ্খ, কুঠার সহ বিভিন্ন অস্ত্র সুসজ্জিত। পুজোর আয়োজক তথা আশ্রমের মহারাজ আত্মপ্রাণানন্দ বলেন, মা দুর্গার একটি অন্যতম রূপ মহালক্ষ্মী। এখানে সেই অষ্টাদশভুজা দেবীর যেমন পুজো হয়, তেমনই কোজাগরি রূপে পুজো পান দেবী। মহালক্ষ্মীর কোনো বাহন নেই। কিন্তু যেহেতু কোজাগরি রূপে পুজো পান অষ্টাদশভুজা দেবী, সেকারণে বাহন হিসেবে মণ্ডপে প্যাঁচা থাকে। পুজোর আয়োজন সম্পন্ন। শুধু বামনগোলা বা হবিবপুর নয়, মালদহের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন ভিড় জমান ব্যতিক্রমী এই লক্ষ্মী পুজোয়।
সালটা ১৯৯৮। আদিবাসী অধ্যুষিত বামনগোলা ব্লকের গাঙ্গুরিয়া এলাকায় আসেন এক পরিব্রাজক। সেখানকার পিছিয়ে পড়া মানুষজন ও শিশুদের দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে ওঠে। উপলব্ধি করেন অভাবের সঙ্গে শিক্ষার অভাব। এরপর এলাকার এক নির্জন জায়গায় বটগাছের নীচে চালাঘর তৈরি করে এলাকার পিছিয়ে পড়া আদিবাসী শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালাতে শুরু করেন পাঠশালা। নানা জায়গায় ভিক্ষা করে সেই পাঠশালায় চলতে থাকে শিক্ষাদান পর্ব। সেদিনের পাঠশালার বর্তমানে নাম সারদা বাণীপীঠ। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য তৈরি করা হয় নিবেদিতা বিদ্যাপীঠ। তিল তিল করে গড়ে ওঠে আশ্রমও। যার নাম গাঙ্গুরিয়া শ্রীশ্রী সারদা তীর্থম আশ্রম। সেদিনের পরিব্রাজক স্বামী গিরিজাত্মনন্দ মহারাজ প্রথম আশ্রমে মহালক্ষ্মী পুজোর প্রচলন করেছিলেন। তারপর থেকে প্রতিবছর আশ্রমে লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে।
বামনগোলায় অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মীকে সকালে বস্ত্র, আলতা, সিঁদুর, চিরুনি সহ ১৬ রকমের উপাচার দিয়ে পুজোর রীতি রয়েছে এখানে। এছাড়া অন্ন, পাঁচ রকমের ভাজা, ডাল, তিন রকমের তরকারি ও মিষ্টান্ন দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় মাকে। যজ্ঞে ১০৮টি বেলপাতা আহুতি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। আবার পূর্ণিমার রাতে নতুন করে বিভিন্ন উপাচারে পুজো হয় দেবীর। তখন অবশ্য অন্নভোগ দেওয়া হয় না। পরিবর্তে নিবেদন করা হয় লুচি-সুজি ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন।
২০০০ সাল থেকে বামনগোলায় মহালক্ষ্মীর এই পুজো হয়ে আসছে আশ্রমে। যেখানে মায়ের শক্তি ও কোজাগরি দুটি রূপেরই সমস্ত রকমের আচার বিধি মেনে পুজো করা হয়ে থাকে, যা দেখতে সকাল থেকে সন্ধ্যা ভিড় জমান মানুষজন। নিজস্ব চিত্র