


দীপেন্দু বিশ্বাস: ফুটবল সম্রাট পেলে, রাজপুত্র ডিয়েগো মারাদোনাকে স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়েছে। সাধ ছিল, একইভাবে লায়োনেল মেসিকে ছুঁয়ে দেখব। তাই সকাল থেকেই আবেগে ভরপুর ছিলাম। বহুদিন পর ফের বল পায়ে মাঠে নামলাম। তবে পুরো সময়টাই নজর ছিল মাঠের ডানপ্রান্তের কাট-আউটের দিকে। নীল কার্পেট পাতা পথ ধরেই যুবভারতীর সবুজ-গালিচায় পা রাখবেন আর্জেন্তাইন মহাতারকা। সকাল ১১-২৫ নাগাদ এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কালো টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে সাদা গাড়ি থেকে মেসি নেমে আসতেই গোটা গ্যালারি উন্মাদনায় ফেটে পড়ল। বলতে দ্বিধা নেই, সেই তালিকা থেকে বাদ পড়িনি আমিও। লিও সামনে আসতেই নিজেকে সামলাতে না পেরে তাঁর বাঁ পা স্পর্শ করি। একইসঙ্গে অটোগ্রাফও নিই। ততক্ষণে গোটা যুবভারতী ‘মেসি, মেসি’ শব্দব্রহ্মে কাঁপছে। তবে কল্পনা করিনি, নিমেষেই তা এভাবে বিভীষিকার রূপ নেবে।
মেসি মাঠে আসার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে থাকে একাধিক মানুষ। তাঁদেরকে বারবার বলেও সরানো যায়নি। আর তাতেই ক্রমশ বিরক্তি বাড়তে থাকে বাঁপায়ের জাদুকরের। বলতে দ্বিধা নেই, এই জায়গাতেই মার খেল আয়োজকরা। আসলে মেসি এমন একজন চরিত্র, যিনি সবসময় সিস্টেমের মধ্যে থাকতে ভালোবাসেন। তাই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের নির্দেশ পেতেই কোনওরকম সময় নষ্ট না করে স্টেডিয়াম ছাড়েন মেসি। সেই সময় তাঁর চোখেমুখে ছিল বিরক্তির ছাপ। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই জায়গায় মারাদোনা থাকলে কিন্তু পরিস্থিতি অন্য হত। হয়তো নিজেই এগিয়ে গিয়ে হাত নাড়তেন। গ্যালারি লক্ষ্য করে দু-চারটে শট মারতেন। তবে মেসি কখনও নিজের বৃত্ত ছেড়ে বেরতে চান না। তাই পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যায়। এর দায় অবশ্যই আয়োজকদের নিতে হবে। তাদের উচিত ছিল, আরও বেশি করে হোমওয়ার্ক করা। অনেক আগেই মেসিকে ঘিরে থাকা মানুষদের সরিয়ে নেওয়া হলে পরিস্থিতি এমন হত না। এমনকী, হুডখোলা গাড়িতে মাঠে ঘোরানোর ব্যবস্থা করা যেত। তাহলে অন্তত অনুরাগীরা প্রিয় তারকাকে ভালো করে দেখতে পেতেন।
সবথেকে বেশি খারাপ লাগছে বাচ্চাগুলোর জন্য। গত কয়েকদিন ধরেই মেসির সঙ্গে দেখা করবে বলে অপেক্ষা করছিল। কত প্রস্তুতি। এমনকী, শনিবার সকাল থেকেই স্টেডিয়ামে অপেক্ষা করতে থাকে তারা। তবে কয়েকজন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের জন্য শুকনো মুখেই বাড়ির পথ ধরতে হল তাদের। আগামী প্রজন্মের জন্য এই ঘটনা খুবই খারাপ বিজ্ঞাপন। লজ্জায় পড়ল গোটা বাংলা। মনে রাখবেন, মেসির জন্য গোটা বিশ্বের নজর ছিল আমাদের উপর। সেখানে এমন এক অভিশপ্ত মুহূর্তের সাক্ষী থাকলাম আমরা। সেই সঙ্গে তছনছ হল আমাদের সাধের যুবভারতী।
অব্যবস্থার দিনলিপি
সকাল ৯-৩০: স্টেডিয়াম সংলগ্ন পাঁচতারা হোটেলে ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’
সকাল ১০-১০: হোটেল থেকেই ভার্চুয়ালি ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন (লেকটাউন)। মেসির সঙ্গে ছিলেন শাহরুখ।
সকাল ১০-৪০: ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মেসির সঙ্গে স্পেশাল ফটোশ্যুট।
বেলা ১১-২৮: হোটেল থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে স্টেডিয়ামে পৌঁছান মেসি।
বেলা ১১-৩০: গাড়ি থেকে নামতেই প্রায় ১৫০ জন সেলিব্রিটি ও মন্ত্রী-আমলাদের ঘেরাটোপে বন্দি কিংবদন্তি।
বেলা ১১-৩৫: মোহন বাগান ও ডায়মন্ডহারবার এফসি’র ফুটবলারদের সঙ্গে করমর্দনের জন্য এগিয়ে যান আর্জেন্তাইন মহাতারকা।
১১-৪০: হ্যান্ডশেকের মাঝেই ছবি তোলার ধাক্কাধাক্কি। সাইডলাইন থেকে দৌড়ে ঢুকে পড়েন তথাকথিত প্রভাবশালীরা। পুলিশ নির্বিকার। রীতিমতো বিরক্ত মেসি।
১১-৪২: মাঠ প্রদক্ষিণ করার কথা ফলাও করে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মেসিকে ঘিরে ভিড়ের চাপে পরিকল্পনার দফারফা। গ্যালারির দিকে সামান্য হাত নেড়েই বেরিয়ে যান মেসি, সুয়ারেজ ও রডরিগো ডে পল।
১১-৪৬: নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী যুবভারতীতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক থাকার কথা ছিল। কিন্তু বেলাগাম পরিস্থিতিতে মাত্র ১৮ মিনিট ছিলেন মেসি। তারপরই তাঁকে গাড়িতে তুলে দেয় কোর টিম। মাঠ থেকে সোজা বিমানবন্দরে রওনা দেন তিনি।
১১-৫০: স্টেডিয়ামে পৌঁছলেও প্রবল উত্তেজনার মধ্যে গাড়িতে বসে থাকেন শাহরুখ খান।
১১-৫২: মেসি মাঠ ছাড়তেই তীব্র ক্ষোভ মাথাচাড়া দেয়। বৃষ্টির মতো উড়ে আসে জলের বোতল।
দুপুর ১২-০০: বাকেট চেয়ার ভেঙে ছোড়া হয় মাঠে। কার্যত হতভম্ব পুলিশ। প্রবল উত্তেজনার মধ্যেই মাঠ থেকে বেরিয়ে স্টেডিয়ামের ভিতরে নিজের অফিসে ফেরেন ক্রীড়ামন্ত্রী।
১২-১৫: ব্যারিকেড-ফেন্সিং উপড়ে মাঠে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। অবাধ ভাঙচুর শুরু। এমনকী গোলপোস্টের জালও খুলে নেওয়া হয়।
১২-৪৫: ক্ষুব্ধ দর্শকদের ধাওয়া করে পুলিশ। মৃদু লাঠিচার্জও চলে।
১-১৮: গোটা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এক্স-হ্যান্ডলে পোস্ট মুখ্যমন্ত্রীর। পাশাপাশি তদন্তের জন্য গঠন করা হয় কমিটি।
১-৩০: খালি করা হয় গ্যালারি। স্টেডিয়ামের বাইরে প্রবল বিক্ষোভ সামলাতে বাড়ানো হয় ফোর্স।
২-৩০: সাংবাদিক বৈঠকে পদস্থ পুলিশ কর্তারা। অন্যতম আয়োজক শতদ্রু দত্তকে দমদম বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তারির ঘোষণা।