


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: জেলার ভোট-রাজনীতিতে কুলীন কেন্দ্র বলেই পরিচিত কৃষ্ণনগর দক্ষিণ। রাজনীতির রথী-মহারথীদের দ্বৈরথে বরাবরই জমজমাট থাকে। ছাব্বিশের ভোটে একটু ব্যতিক্রম। ‘মহারথী’ এবার একজন হিসাবে রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের নাম একরকম ঠিকই ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দলের কে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে জোর চর্চা ছিল রাজনৈতিক মহলে। তারা একরকম ধরেই নিয়েছিলেন বিজেপির যিনিই প্রার্থী হোন, লড়াইটা হবে মূলত দ্বিমুখী। কিন্তু, বামেরা যে তাঁদের আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ট্রাম্প কার্ডটি খেলে দেবেন, তা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি রাজনীতির কারবারিরা। সেই আস্তিনটি আসলে তারুণ্যের ও মেধার প্রতীক লাবণী জঙ্গি। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী গবেষক। দু’জনের উল্টো দিকে বিজেপির যিনি দাঁড়িয়েছেন তিনি সাধন ঘোষ। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির সাধনের পেশা ওষুধের ব্যবসা। হলফনামা মোতাবেক তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক। স্বাভাবিকভাবে যাঁরা এতদিন ধরেই নিয়েছিলেন কৃষ্ণনগর দক্ষিণে এবার দ্বিমুখী লড়াই, তাঁদের ভাবনা ভুল প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন বামপ্রার্থী। অতঃপর, লড়াই হচ্ছে ত্রিমুখী—উজ্জ্বল বনাম লাবণী বনাম সাধন।
লাবণী লড়ছেন সিপিআইএমএলের তিন তারা প্রতীকে। ছাত্র রাজনীতির পর জীবনে এই প্রথম ভোট-রাজনীতিতে। সরাসরি তাঁকে লড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। লড়াইটা কঠিন হলেও এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ তিনি। নওপাড়া থেকে দিগনগর—সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চষে বেড়াচ্ছেন তরুণ নেত্রী। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। সাদামাটা পোশাক। মুখে সারাক্ষণ লেগে থাকা হাসি। কথাবার্তায় মেধার বহিঃপ্রকাশ। তবে, তিনি যেখানে যেমন। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের কাছে লাবণী যাদবপুরের প্রাক্তনী। কৃষক-শ্রমিকদের কাছে তিনি মেঠো বামনেত্রী। হেঁশেলে আবার তিনি আটপৌরে তরুণী। প্রচারে লাবণীর এহেন বহুমাত্রিক ভাবমূর্তি ত্রিমুখী লড়াইকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। ভাল সাড়াও পাচ্ছেন বামপ্রার্থী। প্রত্যন্ত গ্রামের ভিতরে ঢুকে নিজেই লোকজড়ো করে বক্তৃতা রাখছেন। পাশাপাশি, হাতিয়ার করেছেন সোশ্যাল মিডিয়াকেও। সেখানেও ছবি-ভিডিও পোস্ট করে কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভার বিভিন্ন এলাকার মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। প্রচারে অভিনবত্ব আনতে কলকাতা থেকে পথনাটিকার দলও এনেছেন লাবণী। শুক্রবার প্রচার করতে করতে যাদবপুরের প্রাক্তনী বলছিলেন, ‘ফল যাইহোক, মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি, এটাই আমার বড় প্রাপ্তি। মানুষ ভালোবেসে আমাকে গ্রহণ করছেন। তা দেখে আমার মনে হচ্ছে জিতে গিয়েছি। অনেকেই বিভেদের রাজনীতি করে আমাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেননি। সকল সম্প্রদায়ের মানুষ আমাকে ঘরের মেয়ের মতো আপন করে নিয়েছেন।’
রাজ্যজুড়ে পালাবদলের পর থেকে এই কেন্দ্রে টানা তিনবার ঘাসফুল ফুটেছে। তবে এবার লড়াইটা বেশ কঠিন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ২০০৮ সালের আগে এই কেন্দ্রটি কৃষ্ণনগর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। আশি-নব্বইয়ের দশকে কেন্দ্রটি বামদুর্গ ছিল। ২০০১ সালে একবার তৃণমূল কংগ্রেস জিতলেও ২০০৬ সালে ফের আসনটি বামেরা দখল করে। যদিও ২০১১ সালের পর থেকেই এই কেন্দ্রে বামেদের শক্তি ক্রমশ খর্ব হতে শুরু করে।
ভোটের পাটিগণিত বলছে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে সিপিএম পেয়েছিল ৩৯ এবং বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ১৩ শতাংশ ভোট। কিন্তু ২০১৯ সালে বিজেপির ১৩ শতাংশ ভোট বেড়ে হয় ৪৫ শতাংশ। আর সিপিএম পায় মাত্র ৮ শতাংশ ভোট। একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও বামেদের ভোটে খুব বেশি হেরফের হয়নি। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ৮ শতাংশ ভোট বেড়ে হয়েছে ১৩ শতাংশ। ভোটের পরিসংখ্যান অক্সিজেন জোগাচ্ছে বাম শিবিরকে।