


এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ছবি মোদি জমানায় যেন ক্রমশ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে! পোশাকি ভাষায়, ‘বোঝা লাঘব’, যার একমাত্র উপায় হল, ব্যাংকের খাতা থেকে অনাদায়ি ঋণের যৎসামান্য অংশ আদায় করে বেশিরভাগটাই ‘রাইট অফ’ বা মুছে দেওয়া। এই মন্ত্রে গত বারো বছরে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের খাতা থেকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা মুছে দেওয়া হয়েছে ঋণের সামান্য অংশ আদায়ের বিনিময়ে। এই পারস্পরিক বোঝাপড়ার সর্বশেষ উদাহরণ হল, এক শিল্পপতির ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ মাত্র সাড়ে ৬ কোটিতে রফা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইবুনাল। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এই ‘চমৎকার’ ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাংকের সাফাই হল, এতে হিসাবের খাতায় অনাদায়ি ঋণের বোঝা কমবে, তাতে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। আর ব্যাংকের এই ‘বদান্যতায়’ ঋণখেলাপিদের রীতিমতো ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দেওয়ার অবস্থা। কারণ, ১০ টাকা ধার নিলে এক টাকা শোধ দেওয়ার রাস্তা তো ব্যাংকই খুলে দিয়েছে। এইভাবে বছরখানেক অপেক্ষা করলে নতুন ঋণ পাওয়ার রাস্তাতেও আর বাধা থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, এতে ক্ষতি কার? ব্যাংকের মুছে দেওয়া টাকা যেমন সরকারি কর্তাদের পকেট থেকে যায়নি, তেমনই তা কর্পূরের মতো উবেও যেতে পারে না। সন্দেহ নেই, এতে ঋণখেলাপিদের লাভ হলে ক্ষতি হচ্ছে আমানতকারীদের, আম আদমি সৎ ঋণগ্রহীতাদের। কারণ তাঁদের ঋণের তুলনায় বেশি সুদের বোঝা চাপছে। আম আদমির উপর বোঝা চাপানো হচ্ছে মোদি জমানায়।
এই ঋণখেলাপির সিংহভাগ যে বৃহৎ শিল্পপতি ও বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা, তা কোনো গোপন তথ্য নয়। আর কে না জানে, এদের প্রতি মোদি সরকারের ‘দুর্বলতা’র কথা। এই জমানাতেই একাধিক ঋণখেলাপি দেশ ছেড়ে ভিন দেশে চম্পট দিতে পেরেছে অনায়াসেই! সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মোদি জমানায় বড়ো কর্পোরেট ও শিল্পপতিদের প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব বা ‘রাইট অফ’ করা হয়েছে। বিরোধীদের মতে, অঙ্কটা ১৬ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। আবার ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের একটা বড়ো অংশ বিদেশে পালিয়ে গিয়েছে, এই তথ্যও জানাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারই। এ প্রসঙ্গে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উদাহরণ দেওয়া যাক। সম্প্রতি তারা জানিয়েছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ১০০ কোটি টাকার বেশি লোন নেওয়া ঋণখেলাপিদের মোট ২৬ হাজার ৭০১ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা ব্যাংকের খাতা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এদের থেকে ব্যাংক আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩৮৭৪ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, মুছে ফেলা অঙ্কের নিরিখে আদায়ের পরিমাণ মাত্র ১৪.৫ শতাংশ। তার মানে ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি অর্থ স্রেফ ভ্যানিশ। অন্য একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও গল্পটা হল, গত পাঁচ বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণগ্রহীতাদের মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ মকুব করে দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়ের কথা হল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের এই ‘ঘনিষ্ঠ’ মিত্রদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। কারণটা স্পষ্ট, সরকারি অর্থ নিয়ে সমাজের কেষ্টবিষ্টু ঋণখেলাপিরা জালিয়াতি করলেও তাদের সামাজিক সম্মান রক্ষা করতে যেন মোদিবাহিনী দায়বদ্ধ।
এ পর্যন্ত পড়ে কারও যদি মনে হয়, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ বা মকুবের ক্ষেত্রে দেশের সব নাগরিকের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি ও ভূমিকা সমান, তাহলে তাদের জন্য অন্য একটি ছবি তুলে ধরা বাঞ্ছনীয়। যে ব্যাংকে রাঘববোয়ালরা মাত্র ১৪.৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেছেন, সেই ব্যাংক থেকেই ১ কোটির কম লোন নেওয়া ঋণগ্রহীতাদের টাকা শোধ করার হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। সরকারি তথ্যই বলছে, গত দশ বছরে কৃষিঋণ মকুব হয়েছে ১.৬০ লক্ষ কোটি টাকা, যার দশগুণ বেশি মকুব হয়েছে কর্পোরেট ক্ষেত্রে। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, সাধারণভাবে ব্যাংকের ঋণ মেটাচ্ছে কৃষক, গরিব থেকে মধ্যবিত্তরা। কিন্তু ধনীরা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঋণ আদায়ে পেশিশক্তির আস্ফালন দেখা যায় গরিব মধ্যবিত্তদের উপর। বড়োলোকদের জন্য তোলা থাকে জামাই আদর। অথচ আমাদের সংবিধান সমস্ত দেশবাসীর ক্ষেত্রে সমানাধিকারের কথাই বলেছে। তথ্য বলছে, ২০১৪-২০২৪, এই দশ বছরে ঋণ শোধ করতে না পারার হতাশা ও যন্ত্রণায় ১ লক্ষের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। গড়ের হিসাব কষলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন! উলটোদিকের একজনেরও এমন করুণ পরিণতির ( বাঞ্ছনীয় নয়) তথ্য নেই সরকারের কাছে। সন্দেহ নেই, সময় যত এগবে, এই অবস্থা আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। কারণ এই সরকার মুখে গরিব দরদের কথা বললেও তোষণ করে ধনীদেরই। তাই এদেশে ধনী-গরিব বৈষম্যের ছবিটা ক্রমশই প্রকট হচ্ছে। সমীকরণটাও স্পষ্ট। গরিব-মধ্যবিত্ত ঋণ মেটাচ্ছে আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে একশ্রেণির ধনী। একেই বোধহয় নব্য সনাতনী সংস্কৃতি বলে! এটাই হয়তো জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রবাদের আদর্শ পরিস্থিতি, যেখানে আম জনতার সঞ্চয়ের অর্থ নয়ছয় করার সরকারি ছাড়পত্র পায় সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ, একশ্রেণির ধনী ব্যক্তি!