


নয়াদিল্লি: মায়ের সঙ্গে ঝামেলা করেই বাড়ি থেকে পালিয়েছিল মেয়েটি। বয়স মাত্র ১৬ বছর। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। উত্তরপ্রদেশের মইনপুরীর বাড়ি ছেড়ে সে ঠিক করে, নয়ডায় এক তুতো দাদার কাছে গিয়ে থাকবে। সেইমতো বাসেও ওঠে। কিন্তু নয়ডার পরীচকের কাছে ভুল করে নেমেও পড়ে। রাত তখন ৯টা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। গন্তব্য তখনও বহুদূর। বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না ওই কিশোরী। হঠাৎই একটি স্লিপার বাস এসে থামে। দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে কনডাকটর বলে— ‘নয়ডার দিকে যাচ্ছি, উঠে পড়!’ আর সেটাই কাল হল। পর্দা টানা ফাঁকা বাসে ৪৭ কিলোমিটার পথ ধরে দফায় দফায় কিশোরীর উপর চলল পাশবিক অত্যাচার। খুনের ভয় দেখিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে বাসের চালক ও কনডাকটর। পরে সুযোগ বুঝে দিল্লির কাশ্মীরি গেট রিং রোডের কাছে নির্যাতিতাকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। গত ৪ আগস্টের এই ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে সোমবার। আর সঙ্গে সঙ্গে দেশবাসীর মনে উসকে গিয়েছে ১৪ বছর আগে ২০১২ সালে নির্ভয়া কাণ্ডের কালো স্মৃতি। তদন্তে নেমে ইতিমধ্যে উত্তর দিল্লির তিমারপুরের পার্কিং জোন থেকে বাস চালক কুলদীপ (৩৯) ও কনডাকটর সন্দীপকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জানা গিয়েছে, পড়াশোনা নিয়ে বকাবকি করেছিলেন মা। তারপরই কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় কিশোরী। নির্যাতিতা জানিয়েছে, বাসটিতে ওঠার পর সে বুঝতে পারে চালক ও কনডাকটর ছাড়া আর কেউ নেই। পর্দায় ঢাকা পুরো বাস। গাড়ি গড়াতেই কনডাকটর অশালীন আচরণ করতে শুরু করে। এরপর ভয় দেখিয়ে চালক ও কনডাকটর মিলে তাকে ধর্ষণ করে। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে খুনের হুমকিও দেওয়া হয়। প্রায় ৪৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর কাশ্মীরি গেটে তাকে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। খোদ রাজধানীর বুকে (দিল্লি এনসিআর) নির্ভয়া কাণ্ডের পুনরাবৃত্তিতে নিন্দায় সরব কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি। তাদের অভিযোগ, ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা মঞ্চে নারী সুরক্ষা নিয়ে ঢাক পেটালেও বাস্তব পরিস্থিতি খুব খারাপ। নির্ভয়া কাণ্ডের পরও ছবিটা বদলায়নি। গত মে মাসেই দিল্লির রানিবাগে এক মহিলাকে বাসের মধ্যে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। দু’মাস পেরিয়ে আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। দিল্লিতে পুলিশ অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। তারপরও মহিলাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন, ৪৭ কিমি রাস্তায় একাধিক জায়গায় সিসি ক্যামেরার নজরদারি রয়েছে। পুলিশ পোস্ট, ব্যারিকেড রয়েছে। তারপরও এই ঘটনা ঘটে কীভাবে? বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির পুলিশ কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল? দিল্লি পুলিশকে তীব্র সমালোচনা করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দিপকে। তাঁর কটাক্ষ, দিল্লি পুলিশ এখন আপনাদের ফোর্স কোথায় গেল? যন্তরমন্তরে ছাত্রদের বিরুদ্ধে যত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল, তার ১০ শতাংশও যদি দিল্লিতে মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য থাকত তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না।
সোমবার এনিয়ে দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (উত্তর দিল্লি) নীহারিকা ভট্ট জানান, অভিযুক্ত চালক ও কনডাকটরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই বাসটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে পুলিশ। বাসটি সেদিন গ্রেটার নয়ডার সুরজপুরের এক ওয়ার্কশপ থেকে ফিরছিল। তদন্তে নেমে বাসের ভিতর থেকে চুলের নমুনা পেয়েছে ফরেন্সিক টিম। সেগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে একের পর এক ঘটনায় প্রশ্নের মুখে ডবল ইঞ্জিন সরকার।