


নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমেই মনের মধ্যে পরিচিত উচ্ছ্বাস নিয়ে রওনা হলাম বহু পরিচিত রাস্তা ধরে। করোনেশন ব্রিজ একপাশে রেখে চিরকালীন বন্ধু তিস্তাকে সফরসঙ্গী করে মনটাকে ছুটির আনন্দে ভাসিয়ে দিলাম। পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই পৌঁছে যাই কালিম্পং। গুরুপদ্মসম্ভব ভিউ পয়েন্টে এক চমৎকার মনাস্ট্রির পাশে গাড়ি দাঁড় করানো হল। অপূর্ব কারুকার্যময় মনাস্ট্রি। শান্ত পরিবেশ দিয়ে যেতে যেতে একসময় পৌঁছে গেলাম দারাগাঁও। নেপালি ভাষায় ‘দারা’ মানে অনেক উঁচু আর ‘গাঁও’ মানে গ্রাম। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে প্রায় ৯২ কিলোমিটার দূরত্বে প্রায় ৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাহাড়ি গ্রাম। আমাদের ঠাঁই হল গীতা গুরুং ও তার পরিবারের কাছে।
একটু ফ্রেশ হতে না হতেই লাঞ্চের ডাক পড়ল। খেতে বসে গল্প শুরু হয় গীতা গুরুং, তার বউমা আর নাতির সঙ্গে। এক লহমায় আমাদের আপন করে নেয় সবাই। পাহাড়ি মানুষগুলোর এটাই তো নিজস্ব ম্যাজিক! গীতা গুরুংয়ের দুই ছেলে। একজন গ্যাংটকে চলে গেছে, সেখানেই চাকরি করে। আরেক ছেলে এখানে হোমস্টে তৈরি করেছে পর্যটকদের জন্য। নাতি আসু আমার ছেলের বয়সি। হাসিখুশি ছেলেটি গল্প করতে খুব ভালোবাসে।
হোমস্টের ব্যালকনি থেকেই আকাশজোড়া ক্যানভাসে দিগন্ত বিস্তৃত সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘা আর নীচ দিয়ে বহমান পান্না রঙের তিস্তা দৃশ্যমান। কাঞ্চনজঙ্ঘার আকুতিময় ইশারায় এখানে সারাদিন বসে গল্প করা যায় প্রকৃতির সঙ্গে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি সবুজ বৃক্ষরাজি স্বাগত জানায় প্রত্যেক মুসাফিরকে। ছোট ছোট ঝর্ণা আর বন্য ঝোরা ঝংকার তুলে যায় অনবরত। এখানকার প্রকৃতি আর মানুষ শহুরে দূষণের সংজ্ঞা জানে না। সময় কখন যেন নিঃশব্দে কেটে যায়। এখানে সারাদিন জুড়ে চলে কাঞ্চনরঙ্গ। কালিম্পং থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটিতে আছে শুধু মেঘ, পাহাড়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অখণ্ড নীরবতা আর নৈঃশব্দ।
খাওয়াদাওয়া করে একটু আশপাশে ঘুরে দেখতে না দেখতেই বিকেল টোকা মেরে জানান দেয় দিন ফুরিয়ে আসছে। পাহাড়ে চিরকালই সন্ধে নামে তাড়াতাড়ি। আকাশেও আলোর আভা ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। মেঘের গায়ে তখনও কিছুটা আলোর রশ্মি লেগে রয়েছে। কুয়াশার আলোয়ান গায়ে দিয়ে খাদের অতল থেকে পাথরের খাঁজে জমে থাকা মেঘের দল আদুরে আবেশ নিয়ে ঘিরে ধরতে থাকে চতুর্দিক। ডানা ঝাপটিয়ে জংলি পাখির দল এদিক-ওদিক পালিয়ে দূরে ধুপি গাছটার ফাঁকে খুঁজে নিতে চায় মুহূর্ত-আশ্রয়। দিনান্তের নিভে আসা আলোর রোশনাই দেখতে দেখতেই চোখ রাখি আশপাশে। ধূসর হয়ে আসা চরাচরের সঙ্গেই পাহাড়ি স্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে মুখর করে তোলে অকস্মাৎ টুপটাপ বৃষ্টির জলনূপুরের ছন্দ। বৃষ্টির ছন্দে বেআব্রু গাছেরা মাতোয়ারা। ধুয়ে যায় পাথুরে পথ। মুগ্ধ হয়ে চোখ রাখি দূরে মেঘেদের ওই মিনারে। হঠাৎই আসুর ডাক আসে ‘ম্যাডামজি কফি অউর স্ন্যাক্স তৈয়ার হ্যায়।’ কোথাও কোনও শব্দ নেই। প্রকৃতির কোলে মাথা রেখে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে দারাগাঁও। হোমস্টে-র বারান্দায় বসে কফি আর পকোড়া খেতে খেতে ওই পাহাড়ের গায়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি আর রাতের আকাশের তারাদের প্রত্যক্ষ করতে থাকি। পাহাড়ি ঘরগুলোর দ্রুত ঘরকন্না শেষ হয়ে যাবে। ঘুমিয়ে পড়বে সে কিছুক্ষণ বাদে।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। আসু রাতেই জানিয়ে রেখেছিল ‘ম্যাডামজি অগর সানরাইজ দেখনা হ্যায় তো জলদি উঠনা পড়েগা।’ কাচের জানালার পর্দা সরাতেই বিস্ময়! আলোর আভাস। তার উৎস সন্ধানে ব্যালকনিতে চলে আসি। ভোরের হিমেল হাওয়া বইছে। দূর পাহাড়ের গায়ে তখন কুয়াশামাখা ওড়না জড়ানো এক ভোর হচ্ছে। আকাশ আজ মেঘমুক্ত, পরিষ্কার। তার গায়ে রং লাগছে ধীরে ধীরে। চোখের সামনে শুরু হয় কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে সূর্যোদয়। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা দলবদ্ধ মেঘেদের গায়ে রং লেগে লাজে রাঙা হয়ে উঠতে থাকে তারাও। ধীরে ধীরে রোদের তেজ বৃদ্ধি পায় আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সারা শরীরে তার রঙের সোহাগ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আস্তে আস্তে সেই রক্তিম বরণ হারিয়ে ফুটে উঠতে থাকে রৌপ্যময় শুভ্রতার ঝলক। অক্ষয় এই মুহূর্তগুলোর কাছে ঋণ স্বীকার করে রাখি।
বেলা বাড়তেই চা খেয়ে গোটা গ্রাম একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখব বলে আবার বেরিয়ে পড়ি। সবুজ উপত্যকা জুড়ে ছোট ছোট খেলনা বাড়ি। রুটিনবিহীন জীবনে দূষণহীন পরিবেশে ভাবনাহীন উন্মুক্ত মনের ডানা মেলে দেই। পর্যটন মানচিত্রে এখনও সেভাবে জাঁকিয়ে বসতে পারেনি নিরিবিলি এই গ্রামটি। তাই তো এখনও এই গ্রামের আনাচে-কানাচে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যাওয়া যায়। হোমস্টে-র পাশ দিয়ে একটি পাথুরে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই। কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল একটি ছোট্ট গুম্ফা। মহিলা লামাদের দ্বারা পরিচালিত এই গুম্ফার নাম দেনচেনচোলিং মনাস্ট্রি। গুম্ফা ছাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে আরও কিছুটা নেমে গেলে একটি টেবিল ল্যান্ড। জায়গাটির পোশাকি নাম হিমালি পার্ক। চতুর্দিকে অযত্নে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে নানা বর্ণের ফুল আর তার চারধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে রঙিন প্রজাপতি। সামনে দিগন্তবিস্তৃত ৩৬০ ডিগ্রি ভিউতে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিস্তার। এখানে একসময় প্রচুর সিঙ্কোনার চাষ হতো। এখানকার প্রধান জীবিকা, চাষবাস আর চাকরি। গোটা গ্রামেই অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। ভুট্টা, বড় এলাচ এবং মরশুমি নানারকম সব্জির চাষ করা হয়। পথ ধরে চলে আসি হোমস্টে-র সামনে। সেখান থেকে আরেকটি রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে মহাদেব ধামে। গ্রামের মধ্যেই অবস্থিত ছোট্ট মন্দিরটি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় বেশ কিছুটা। চতুর্দিক অরণ্য আচ্ছাদিত সিঁড়ি বেয়ে একসময় পৌঁছে যাই মন্দির প্রাঙ্গণে। ছোট্ট একটি জলাশয়ে মহাশোলদের অবাধ বিচরণ। বেশ সুন্দর আরণ্যক পরিবেশে মন্দিরের অবস্থান। মহাদেব ধাম স্থানীয়দের কাছে এক অতি পবিত্র স্থান এবং জাগ্রত মন্দির। তাদের বিশ্বাস এখানেও কোন মানত করলে ভগবান সেই মনোকামনা পূরণ করেন। ভিতরে কোনও শিবমূর্তি বা বিগ্রহ নেই। প্রাকৃতিক নিয়মই পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে জল পড়ে পাথুরে গুহার গায়ে মহাদেবের জটার আকৃতি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য আরও নানা আকৃতি ধারণ করেছে। মন্দিরের পুরোহিত দেখিয়ে দিলেন কোনটা নাগদেবীর আকার নিয়েছে আর কোনটা গণেশের মুখের আদল।
শ্রাবণ মাসে মহা ধুমধাম করে
পুজো হয়, দূরদূরান্ত থেকে অনেক লোক পুজো দিতে আসেন। ফিরে আসি অস্থায়ী আবাসে। পাড়ি দেব আবার অন্য কোনও জায়গায়। মনের নিভৃত কোণে রেখে দিই পাহাড়ি জনপদ, নদী, ঝর্ণা, পাইন-ধুপি-জুনিপার, মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুরের দৈনন্দিন গাথামালার উজ্জ্বল মুহূর্তগুলি।
কীভাবে যাবেন: নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি যাওয়া যায়। দারাগাঁওয়ে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো জায়গা আছে।
নন্দিতা মিত্র