


সংবাদদাতা, ডোমকল: বাড়ি সাগরপাড়া। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। এসেছিলেন ইসলামপুরে। ভৈরব ব্রিজের নীচে ব্যাগ হাতে তাঁকে ঘোরাফেরা করতে দেখেই ছেলেধরা সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। ঘিরে ধরেন সকলেই। তারপর টেনে হিঁচড়ে টোল প্লাজার সামনে রাস্তায় ফেলে থানা থেকে কয়েকশো মিটার দূরেই চলে মারধর-টানাটানি। ভাগ্যিস! কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসে পুলিশ। তা না হলে ওই মহিলাকে পিটিয়েই মেরে ফেলত উত্তেজিত জনতা। সপ্তাহখানেক ধরে ইসলামপুর, ডোমকল-সহ মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় বারবার ছড়াচ্ছে ছেলেধরা গুজব। আর সেই গুজবের কোপে পড়ে টার্গেট হচ্ছেন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ থেকে ভবঘুরেরা। শুধু ডোমকলই নয়, জেলাজুড়ে এভাবে বারবার ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন সমাজকর্মীরা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজনও। পালটা এই গুজব বন্ধ করতে কড়া হাতে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে পুলিশ।
গত সপ্তাহখানেক ধরে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ছেলেধরা গুজব। ইসলামপুরের ভৈরব সেতু এলাকায় এমন একটি ঘটনার পর দিন দুয়েকের মধ্যেই ইসলামপুরের ঈশাননগর এলাকায় আবারও ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রাতের বেলা এলাকায় ছেলেধরা ঢুকেছে বলে গুজব রটে যায়। এদিকে দিন দুয়েক আগে ডোমকলের আমিনাবাদ এলাকাতেও একইভাবে এই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
আর এই সব ঘটনার ক্ষেত্রেই বেশিরভাগ সময় টার্গেট হচ্ছেন বয়স্ক মানুষ, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কিংবা ভবঘুরেরা। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সময়মতো পৌঁছে তাঁদের উদ্ধার করলেও বারবার এভাবে তাঁদের লক্ষ্য করে সন্দেহ ছড়ানোয় উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, তাঁদের মধ্যে কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন আবার কেউ ভবঘুরে হওয়ায় অনেক সময়ই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন না। আর তাতেই সন্দেহ আরও বাড়ে। এতে যেমন তাঁদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনই সাধারণ মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও সামনে আসছে।
ছেলেধরা গুজবের সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন না অল্পবয়সীরাও। গত সপ্তাহেই লালগোলার সিতেশনগর এলাকায় দুই যুবক-যুবতী কয়েকজন বাচ্চার সঙ্গে গল্প করছিলেন। তাঁদের ছেলেধরা সন্দেহে ক্ষিপ্ত জনতা তাঁদের চারচাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে জানা যায়, তাঁরা কেউই ছেলেধরা নন। নিছক সময় কাটানোর জন্যই কয়েকজন বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করছিলেন।
কিন্তু বারবার এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে কীভাবে? কেনই বা ছড়াচ্ছে? ডোমকল গার্লস কলেজের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্রিয়ঙ্কর দাস বলেন, গুজব এমন বিষয় যা খুব দ্রুত মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। অনেক সময় আমরা নিজেরাও জানি বিষয়টি বাস্তব নাও হতে পারে, তবুও সেটিকে বাস্তবের মতো করে কল্পনা করে ছড়িয়ে দিই। তাই কোনও খবর ছড়ানোর আগে তা যাচাই করা এবং সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
ডোমকলের এসডিপিও শুভম বাজাজ বলেন, এই ধরনের ছেলেধরা গুজবে কোনওভাবেই কান দেবেন না। কোনও বিষয় সন্দেহজনক মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানান। কিন্তু কোনওভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। কেউ যদি গুজবের জেরে কাউকে ঘিরে ধরে মারধর বা হেনস্তা করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাই সবাইকে বলব, কোনও গুজবে কান দেবেন না।