


নিজস্ব প্রতিনিধি, সাঁইথিয়া: দিনের আলো নিভলেই ময়ূরাক্ষীর নিস্তব্ধ চরে শুরু হয় যান্ত্রিক গর্জন। চালু হয়ে যায় নৌকায় লাগানো বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র। তাতেই নদীগর্ভ থেকে দেদার উঠতে থাকে বালি। সেই বালি মজুত হয় নদীর পাড়ে। রাত যখন একটু গভীর, দোকানপাট বন্ধ হয়ে চারদিক যখন শুনশান তখনই নদীর বুক চিরে প্রবেশ করতে থাকে একের পর এক ডাম্পার। দেদার পাচার হচ্ছে বালি। সাঁইথিয়া শহরের দইকোটা হানাবাড়ি এলাকায় রাতের অন্ধকারকে ঢাল করে এই কারবার চলছে। প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে বালি লুট হওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তেমনই সংস্কার হওয়া সাঁইথিয়া সেতুর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় সূত্রের খবর, সাঁইথিয়ার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ নতুন ব্রিজের অদূরেই দইকোটা হানাবাড়ি। সেই এলাকা থেকে অবাধে লুট হচ্ছে বালি। বালি তোলার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে নৌকায় লাগানো বিশেষ শক্তিশালী যন্ত্র। নিয়ম অনুযায়ী, নদী থেকে এভাবে যন্ত্রের সাহায্যে বালি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি, সম্প্রতি জেলা পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকায় বালি তোলা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞা আসলে ‘লোকদেখানো’। দিনের পর দিন হানাবাড়ি ঘাটে রাতের অন্ধকারে নিয়ম ভেঙে প্রকাশ্যেই যান্ত্রিক লুটতরাজ চলছে।
অবৈধ কারবার ঘিরে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, নদী থেকে বালি বোঝাইয়ের পর সেইসব ডাম্পার এসে উঠছে সাঁইথিয়া-মহম্মদবাজার রাজ্য সরকার হানাবাড়ি এলাকায়। তারপর তা চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। বৈধ নথিপত্র ছাড়াই কীভাবে সারারাত শয়ে শয়ে বালির গাড়ি মূল রাস্তা দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা। অভিযোগ, মাফিয়া-নেতা ও প্রশাসনের একাংশের অশুভ আঁতাতেই সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণির পকেট ফুলেফেঁপে উঠছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হল সাঁইথিয়া সেতুর স্বাস্থ্য। অবাধে বালি তোলার ফলে তিলপাড়া ব্যারেজ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই একই পরিণতির দিকে এই সেতুটিও এগোচ্ছে বলে মত অনেকের। সাঁইথিয়ার সঙ্গে রামপুরহাট, কোটাসুর, মহম্মদবাজার, ময়ূরেশ্বর ও বহরমপুরের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই সেতু। বছরখানেক আগেই সেতুর সংস্কার করা হয়েছে। এমনিতেই সেতুর উপর দিয়ে বছরভর ওভারলোডেড ডাম্পার চলাচল করে। তার উপর সেতুর একদম কাছ থেকে এভাবে বালি তোলার ফলে পিলারের গোড়া আলগা হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এনিয়ে সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। তাদের দাবি, শাসকদলের মদত ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া এই লুট সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, প্রশাসন দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী সেতুটি প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়বে। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলাশাসক(ভূমি ও ভূমি সংস্কার) শুভম আগরওয়াল বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।