


সংবাদদাতা, লালবাগ: বৈচিত্রের পাশাপাশি স্বাদ ও গন্ধে মুর্শিদাবাদের আমের জুড়ি মেলা ভার। এই জেলার আমের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে নবাবদের নাম। বলা হয়, নবাবদের বাগানে পেস্তা, তোতা, চম্পা, সারেঙ্গা, সাহুপসন্দ, জাহান্নারা, চন্দনকোষা, কোহিতুর, কালাপাহাড়, বীরা, হিমসাগর, ল্যাঙড়া, দিলসাধ, কিষানভোগ, রানিপসন্দ, বেগম পসন্দ, দিলপসন্দ সহ প্রায় ২০০ প্রজাতির আমগাছ ছিল। নবাবদের সময় থেকে মুর্শিদাবাদের আমের সুখ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নানা কারণে কিছু আমের প্রজাতি মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে হারিয়ে গিয়েছে এবং আরও বেশ কিছু প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। আমবাগানের মালিক ও চাষিদের দাবি, বর্তমানে ৪০-৫০ প্রজাতির আমের অস্তিত্ব রয়েছে। যদিও বাজারে হিমসাগর, ল্যাঙড়া, রানি, চম্পা, বোম্বাই সহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতির আম পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে নবাবি আমলের বিভিন্ন প্রজাতির আম ফিরিয়ে আনতে প্রায় তিন বছর আগে উদ্যোগ নিয়েছিল রাজ্য উদ্যানপালন দপ্তর। রাজ্যের বিচার বিভাগের অধীনে থাকা মুর্শিদাবাদ এস্টেটের খানপুর মৌজায় ২৬.৩৫ একর এবং কদমশরিফ মৌজায় ৭.৩৩ একর জমি চিহ্নিত করে মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির আমগাছ লাগানোর পরিকল্পনা হয়। রাজ্য বিচার বিভাগ থেকে উদ্যান পালন দপ্তরে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরুও হয়। সূত্রের খবর, পরবর্তীতে আর কাজ এগয়নি। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে সরিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। নতুন সরকারের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন মুর্শিদাবাদের বিধায়ক গৌরীশঙ্কর ঘোষ। আর তাতেই আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছেন বাগান মালিক, আমচাষি থেকে আমরসিক জেলাবাসী। থেমে থাকা প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, মুর্শিদাবাদের বুক থেকে বিলুপ্ত এবং বিলুপ্তপ্রায় আমের প্রজাতিগুলিকে ফিরিয়ে আনতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁ এবং পরবর্তী নবাবরা আমের বিষয়ে শৌখিন ছিলেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিঘের পর বিঘে জমিতে আমবাগান গড়ে ওঠে। আমবাগান দেখভাল ও পরিচর্চার জন্য নবাবরা অভিজ্ঞ লোক নিযুক্ত করতেন। তাঁদের পোশাকি নাম ছিল আম কেরানি বা আম পেয়াদা। তাঁরা সারাদিন বাগানে পড়ে থাকতেন। সন্তানের মতো যত্নে গাছের পরিচর্চা করতেন। নবাবদের উৎসাহে আম পেয়াদারা শংকরায়ন ঘটিয়ে নতুন নতুন আমের প্রজাতি তৈরি করতেন। নতুন প্রজাতির আমের নামকরণ করতেন নবাবরা। তবে কোহিতুর আমের নামকরণ কোনো এক আম কেরানি করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু নবাবিয়ানার পাশাপাশি তখনকার আমের প্রজাতিগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে। তোতা, পেস্তা, দিল পসন্দ, বেগম পসন্দ, চন্দনকোষা, কোহিতুর, কালাপাহাড় প্রভৃতি প্রজাতির আম লালবাগের বাগানগুলি খুঁজলে হয়ত দু’-একটি পাওয়া যেতে পারে। মুর্শিদাবাদ জেলা হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, কয়েক দশক আগেও লালবাগ শহরজুড়ে আমের বাগান ছিল। গত এক দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাগান কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। ফলে অনেক দুর্লভ প্রজাতির আম হারিয়ে গিয়েছে। যেগুলি রয়েছে সেগুলির ঠিকমতো দেখভাল ও পরিচর্চা হয় না। আমাদের বিধায়ক পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন। আমরা চাইব, হারিয়ে যাওয়া আমের প্রজাতিগুলো ফিরিয়ে আনতে তিনি উদ্যোগী হবেন। মুর্শিদাবাদ এস্টেটের ম্যানেজার বিপ্লব সরকার বলেন, খানপুর ও কদমশরিফ দুই মৌজায় মোট ৩৫ একর জমিতে উদ্যানপালন দপ্তর আমের বাগান তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিল। জমি হস্তান্তর হয়েছে বলে শুনেছি। জেলা উদ্যানপালন আধিকারিক প্রিয়রঞ্জন সন্নিগ্রাহী বলেন, ওই জমিতে গত বেশ কয়েক দশক ধরে স্থানীয় কিছু মানুষ চাষাবাদের পাশাপাশি বসবাস করছেন। সেটা একটা সমস্যা।