


সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: স্ট্রেচারে টানটান শায়িত শুভমান গিল। ঘাড়ে আটকানো নেক বেল্ট। যাতে নড়াচড়া না হয়। ফ্লাডলাইট জ্বলে ওঠা ইডেনে পাঁচ-সাতজন স্বাস্থ্যকর্মী ঠেলছেন স্ট্রেচার। নিয়ে যাচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে। কে ভেবেছিল টিম ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন এভাবে মাঠ ছাড়বেন!
একটু পরেই এল আরও মারাত্মক খবর। প্রাথমিক পরীক্ষার পর দক্ষিণ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ২৬ বছর বয়সি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘাড়ে অস্বস্তি টের পেয়েছিলেন। মাঠে এসে সিএবি’তে স্পেশালিস্ট ডাক্তার খুঁজে পাননি। ক্রিজে গিয়ে সেই ব্যথাই চরমে ওঠে। ‘নেক স্প্যাজম’ এর জেরে তিন বল খেলেই রিটায়ার্ড হার্ট। কিন্তু সেক্ষেত্রে কেন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করা হল? আরও অনেক আগেই তো চিকিৎসা শুরু করা যেত। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে রবিবার গিলের ব্যাটিংয়ের কার্যত কোনও সম্ভাবনা নেই। এমনকী, গুয়াহাটি টেস্টে খেলাও অনিশ্চিত।
সাতসকালে কর্পোরেট বক্সে পৌঁছে যাওয়া বাবার তাই দিনভর মন খারাপ। সাদা শেরওয়ানি-পাজামা, গালে খোঁচা খোঁচা হালকা দাড়ির লখিন্দার সিংকে দেখাচ্ছিল অসহায়। প্রথমবার ইডেনে ছেলের টেস্ট খেলার মুহূর্ত স্মরণীয় হওয়ার আশায় এসেছিলেন। কিন্তু এমন হবে কে জানত! লাঞ্চের পর পাশে বসা পরিচিত একজন জানালেন, ‘ছেলে চোট পেয়ে ড্রেসিং-রুমে ফিরে যেতেই চরম উদ্বেগ ঘিরে ধরেছে। শরীরে অস্বস্তি হচ্ছে। দুশ্চিন্তাই এর কারণ।’ ছেলের ঘাড়ের চোট কতটা গুরুতর, তখনও স্পষ্ট ধারণা আসেনি। সেই ধোঁয়াশাই আরও অস্থির করে তুলেছিল। বাড়ি থেকে ঘনঘন আসছে ফোন। গিলের কী হয়েছে, জানতে আগ্রহী আত্মীয়রা। কিন্তু উত্তরটা লখিন্দারের কাছেও নেই। সেজন্যই ছটফট করা। প্রবল টেনশনে দুপুরে বিশেষ কিছু খেতেও পারেননি। চায়ের বিরতির সময় তাই খিদে পেয়ে যায়। তখন রিফ্রেশমেন্ট রুমে মুড়িমাখা ছাড়া কিছু নেই। বাধ্য হয়ে কাগজের ঠোঙা হাতে নেওয়া। কিন্তু মুড়িতে কি আর পেট ভরে!
অথচ, শুক্রবার রীতিমতো হাসিখুশি দেখাচ্ছিল লখিন্দারকে। এক ক্রিকেটপ্রেমী প্রশ্ন করে বসেন, ‘আঙ্কেলজি, গিল ভাই কা শাদি কব হোগা?’ অর্থাৎ, গিলের বিয়েটা কবে হচ্ছে? একধাপ এগিয়ে আর একজন জানতে চান, ‘সারা ম্যাডামের সঙ্গেই কি বিয়ে হবে?’ সারা তেন্ডুলকরের সঙ্গে গিলের সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন অনেক দিনের। সেটাই স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা। মুচকি হেসে লখিন্দার উত্তর দেন, ‘বিয়ে নিয়ে শুভমান এখনই ভাবছে বলে মনে হয় না। ওর ইচ্ছেই আসল।’
এদিন অবশ্য মুখ থেকে ব্লটিং পেপারের মতো কেউ শুষে নিয়েছিল হাসি। সারাক্ষণই থমথমে। পাশে বসা পরিচিত জন বোঝাচ্ছিলেন, চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু বাবার অশান্ত মন তাতে স্থির হয়নি। প্রোটিয়াদের উইকেট পড়লে উঠে দাঁড়িয়ে হাত ঝাঁকালেও গুমোটভাব কাটেনি। বরং সন্ধের দিকে টেনশন কয়েকগুণ বাড়ল। স্ট্রেচারে শুয়ে ছেলে মাঠ ছাড়লে, হাসপাতালে ভর্তি হলে কোন বাবা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন!