


ব্রতীন দাস, মালদহ: ছয় দশক ধরে গঙ্গার পাড়ে বাস। কিন্তু নদীর এমন রুদ্রমূর্তি আগে কখনও দেখেননি ইংলিশবাজার ব্লকের মিল্কির খাসকোল গ্রামের বাসিন্দা শেখ নহিমুদ্দিন। বললেন, গঙ্গার গর্জনে বিনিদ্র রাত কাটছে। নদী যেভাবে ধেয়ে আসছে, আর সাহস পেলাম না। তিল তিল করে জমানো অর্থে একটা পাকা বাড়ি তৈরি করেছিলাম। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাধের সেই বাড়ি নিজের হাতে ভাঙতে শুরু করেছি। অন্তত ইটগুলো যদি বাঁচাতে পারি! না হলে তো সবটাই বিলীন হয়ে যাবে গঙ্গার গর্ভে।
শুধু নহিমুদ্দিন নন, গঙ্গার ভাঙনের হাত থেকে বাঁচতে গোটা খাসকোল গ্রাম কার্যত উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এদিন গ্রামে পা রাখতেই দেখা যায়, গঙ্গার গর্জনের সঙ্গে ভিটেমাটি ছেড়ে পালানো মানুষের কান্নায় ভারী বাতাস। ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেন শেখ ফারাজ। নিজের জমানো টাকা আর কিছুটা ধার নিয়ে চার বছর আগে একটা পাকা বাড়ি করেছিলেন। এখনও ধারের টাকা পুরোটা শোধ করতে পারেননি। কিন্তু গঙ্গা কার্যত উঠোনে চলে আসায় নিজে হাতে সেই বাড়ি ভেঙে ফেলতে হচ্ছে ফারাজকে।
শ্বশুরের ভিটেয় একটা বাড়ি বানিয়েছিলেন সোনবানু বিবি। গঙ্গার জল বাড়ছে দেখে ছেলেমেয়ে, গবাদি নিয়ে তড়িঘড়ি খাসকোল হাইস্কুলে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খবর আসে, গঙ্গা গিলে খেয়েছে সবটা।
একদিকে যখন মালদহের মানিকচকের ভুতনি, রতুয়া কিংবা বৈষ্ণবনগরে বন্যায় দেড় লক্ষের বেশি মানুষ চরম সংকটে, সেখানে নতুন করে প্রশাসনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে খাসকোলের ভাঙন। এই পরিস্থিতিতে দু-একদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে আসতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এনিয়ে যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে রাখছে জেলা প্রশাসন। বৈষ্ণবনগরে বন্যার জলে ডুবে এদিন এগারো বছরের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের নাম রাইহান রহমান। গঙ্গার জলস্তর নতুন করে না বাড়লেও এখনও চরম বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে নদী। বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে ফুলহার। ক্রমেই বাড়ছে ফুলহারের জল। বিপদসীমা এখনও না ছুঁলেও জল বাড়ছে মহানন্দাতেও। বাসিন্দাদের দাবি, খাসকোলে বিশাল এলাকাজুড়ে ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছে গঙ্গা। কোথাও রোজ পাঁচ হাত করে ভাঙছে। কোথাও ভাঙছে দশ হাত। ইতিমধ্যে পিএইচইর পাম্প হাউস বিলীন হয়ে গিয়েছে গঙ্গা গর্ভে। আগ্রাসী গঙ্গা ধেয়ে আসছে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের দিকে। ১৯৯৮ সালে খাসকোলের বাঁধ ভেঙে কালিন্দী নদী দিয়ে মহানন্দা হয়ে জল ঢুকে পড়েছিল ইংলিশবাজার শহরে। এবারের পরিস্থিতিও যে উদ্বেগজনক, তা মানছে প্রশাসনও।