


আজ আন্তর্জাতিক নারীদিবস। ৫০টি বসন্ত পার করে কী ভাবছেন ওঁরা? নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন পাঁচ নারী।
বোঝাপড়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা চাই
প্রতিবছর নারীদিবস আসে যায়, নারীর অবস্থা কিছুটা হলেও তো বদলায়। এই দিবস পালনের মাধ্যমে প্রত্যেক নারীর স্বাধীনতা বোধকে কিছুটা উদ্দীপ্ত করা যায়। মহিলাদের সচেতন করে তোলাও সম্ভব হয়। প্রথাগত শিক্ষার মতো মানসিক এবং মানবিক শিক্ষার হার বৃদ্ধির যথেষ্ট প্রয়োজন। তবেই সমাজে নারী স্বাধীনতা অর্থবহ হবে। নারী স্বাধীনতার জন্য মিটিং, মিছিল, সভার গুরুত্ব থেকেও আমার মনে হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়ার প্রয়োজন। নাহলে নারী স্বাধীনতা আসবে বলে মনে হয় না। জোর করে কিছু আদায় করার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাধীনতার বাতাবরণ তৈরি হলে তা অনেক বেশি ফলপ্রদ ও চিরস্থায়ী হতে পারে। এক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিত্বই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিত্ব দিয়ে নিজের স্বাধীনতা অর্জন করা যায়। আজ আমি ৬৫ বছরের দোরগোড়ায়। জীবনে চলার পথ মোটেই মসৃণ নয়। প্রচুর বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে প্রতি পদে। আমার ইচ্ছে, আমার পড়াশোনা, আমার কেরিয়ার সমস্ত ক্ষেত্রে। কিন্তু কোনও আন্দোলন বা সাংসারিক বিবাদের মধ্যে না গিয়ে আজও এই বয়সে আমার শিল্পী সত্তাকে বজায় রাখতে পেরেছি। এটাই আমার স্বাধীনতা। শিল্পীর স্বাধীনতাকে বজায় রাখতে নীরব লড়াই চালিয়ে চলেছি। শিল্পীসত্তা তার সৃষ্টির মধ্যে বেঁচে থাকতে চায়। কোনও নারী তাঁর শিল্পসত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনযাপন করতে পারলে তাই প্রকৃত স্বাধীনতা।
সুনন্দা সান্যাল, বোলপুর, বীরভূম
নারী ছাড়া পৃথিবী বড়ই অচল
আমি একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যাপিকা। জীবনের অর্ধেক শতক পার হয়ে আজ সব চাওয়া পাওয়ার হিসেব করতে বসে দেখলাম যদিও প্রকৃতির নিয়মে নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক, তবুও নারীর স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ছাড়া এ পৃথিবী অচল। এক সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ছাড়া, যে মানুষ যত উঁচুতেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, নারীর কোমল পরশপাথরের ছোঁয়া ছাড়া তার জীবন থেকে যায় অসম্পূর্ণ। আমার একমাত্র সন্তান, বিদেশে কর্মরতা, সারাদিন তার ব্যস্ততা, কখনও যদি মনখারাপ হয়, যদি একা লাগে, ভরসার জায়গা সেই মা। স্বামী কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই। কিন্তু বুকের ভিতরটা যখন হঠাৎ চিনচিন করে ওঠে, তখন হয়তো তার ইচ্ছে হয় ভারী হয়ে আসা মাথাটা প্রেয়সীর সেই শান্তিমাখা কোলটায় একটু এলিয়ে দিতে। আমিই সেই নারী, যাকে একা হাতে সামলাতে হয় সবকিছু। সন্তানের চাকরির যুদ্ধ, পঞ্চাশোর্ধ্ব স্বামীর শারীরিক ও মানসিক চাপ, ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা, নিজের কলেজ, ছাত্রছাত্রী, বাড়ির কাজ, স-ব। তবু আমি ভেঙে পড়ি না, আমার উপর যে নির্ভরশীল সবাই। আমার তো বিশ্রাম নিলে চলবে না, আমাকে তো এগিয়ে চলতে হবে সবাইকে নিয়ে। সবার আনন্দেই যে আমার আনন্দ! আজ আমি মনে করি এই অনন্ত চাহিদার জগতে ঈশ্বর আমাকে যা দিয়েছেন, তাই নিয়ে আমি সন্তুষ্ট, পরিতৃপ্ত এবং পরিপূর্ণ।
ডঃ সুতপা মুখার্জি, মতিঝিল অ্যাভিনিউ, কলকাতা ৭৪
আমার কাছে প্রতিটি দিনই নারীদিবস
প্রৌঢ়ত্বের চৌকাঠে পদার্পণ করা এক নারী যার কেশদামে ইতিউতি লুকোচুরি খেলে বেশ কিছু রুপোলি রেখা, আজ হিসাবের খাতা খুলে বসেছে জীবনের অঙ্ক মেলাবে বলে। উঁহু, কিছুতেই হিসাব মিলছে না। অপ্রাপ্তির চেয়ে প্রাপ্তির পাল্লাই যে ভারী! শৈশবের আঙিনায় চোখ রেখে সে দেখে এক শিশুকন্যা নির্মল আনন্দে পিতা-মাতার স্নেহচ্ছায়ায় অথচ কঠোর অনুশাসনের ঘেরাটোপে খেলতে খেলতে পা রাখছে কিশোরীবেলায়। পড়াশোনার পাশাপাশি আদ্যন্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সে তার ইচ্ছেডানা মেলে। সঙ্গীত, অঙ্কন, আবৃত্তি, লেখালেখি তার পছন্দের বিষয়। হ্যাঁ, আমিই সেই নারী যার কাছে স্বাধীনতা আর নিয়মানুবর্তিতা সমার্থক।
আর সেই শিক্ষাই আমার সন্তান তথা পরবর্তী প্রজন্মকে শিখিয়ে চলেছি। অনেকের মতোই কন্যা, জায়া ও জননী রূপে আমার জীবন আবর্তিত। তবে আমার কাছে প্রতিটি দিনই নারীদিবস, বন্ধু দিবস, পিতৃদিবস কিংবা মাতৃদিবস। তা সত্ত্বেও বলব প্রতি বছর নারীদিবসে কর্তামশাই যখন হাতে একটা চকোলেট দিয়ে বলেন ‘হ্যাপি উইমেন’স ডে’ তখন ভাবি, বিশেষ দিন বেছে নিয়ে এই ছোট্ট উদযাপনটুকু মন্দ কী! ওঁরই একান্ত উৎসাহে প্রকাশিত হয়েছে আমার প্রথম একক গ্রন্থ। কিন্তু এ আনন্দের ভাগীদার হতে পারেননি আমার মা। দেখে যেতে পারেননি সেই মুহূর্ত। তাঁর অকালপ্রয়াণে আমি আজও বেদনার্ত। সময় যদিও এগিয়ে চলে নিয়মের স্রোতে। সব ভালোর মধ্যেও মনে চিন্তা আসে। এত আধুনিক সমাজব্যবস্থা সত্ত্বেও নারী আজও নির্যাতিতা, লাঞ্ছিতা হন পদে পদে। জীবনের পথে শুধু নারী হওয়ার জন্যই তাঁকে পিছিয়ে যেতে হয় কখনও কখনও। এটা কঠিন বাস্তব। হতাশ হয়ে ভাবি এ কোন স্বাধীনতা? নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের বোধই প্রকৃত শিক্ষা। বিদ্রোহী কবির সুরে গলা মেলাই— ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
মনীষা বসু, রুবি পার্ক ইস্ট, কলকাতা ৭৮
আমরাই তো আমাদের গল্পের নায়িকা
বিশ্বব্যাপী ঘটা করে নারী দিবস পালিত হলেও কি সবক্ষেত্রে নারী তার সম্মান, মর্যাদা, অধিকার পায়? আমি একজন নারী হিসাবে বলতে চাই, এই বাহান্ন বছরের জীবনে অভিজ্ঞতার ভাঁড়ারে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সংখ্যা নেহাত কম নয়! মেয়েবেলায় পরিবারের স্নেহ যথেষ্ট পরিমাণে পেয়েছি, মেয়ে বলে দাদাদের তুলনায় আমাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এমন নয়। বরং মা-বাবার কাছে আমি ছিলাম আদরের। কিন্তু তবুও মেয়ে হিসাবে কোথাও একটা নির্দিষ্ট গন্ডি থেকে গিয়েছে। সমাজের বাঁধা ছকের গন্ডিতে বাঁধা পড়ে অধরা স্বপ্ন নিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। আর বিয়ের পর হয়েছি গৃহবধূ। প্রাপ্তি হিসাবে পেয়েছি অনেক কিছুই, তবে অপ্রাপ্তিও কম কিছু নয়।
ভালো মা, ভালো বউ হওয়ার পাশাপাশি কোথাও যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে নিজের উপযুক্ত সম্মান পাইনি। মুখ বুজে কত কিছু সহ্য করতে হয়েছে কখনও কখনও, সংসারের কর্তব্য, দায়িত্বের মাঝে হারিয়ে ফেলেছি নিজের সত্তাকে! ভুলে গিয়েছি আমারও একটা জন্মদিন আছে যেদিনটা শুধু আমার জন্য, হারিয়ে ফেলেছি নিজের ভালোলাগা, মনখারাপ। অন্যদের আনন্দ খুঁজে দিতে গিয়ে নিজের শখ, সাজগোজ, ভালোবাসার জিনিস সবই একটা সময় যেন হারিয়ে ফেলেছি।
তবুও এত এত না পাওয়ার ভিড়ে ছোটবেলায় দেখা নিজের স্বপ্নটা পূরণ করেছি। ইচ্ছা ছিল ছোট হলেও নিজে কিছু করব, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হব। বর্তমানে আমি শিক্ষিকা। নিজের স্বপ্নপূরণের প্রাপ্তির কাছে অপ্রাপ্তিগুলো এখন তাই মিলিয়ে যায়। সকলকে আমি একটা কথাই বলব, নারী দিবস হোক সেই উপলক্ষ যেদিন আমরা শুধু অন্যদের জন্য নয়, নিজের জন্যও ভালোবাসা রাখব। নিজেকে শ্রদ্ধা করব। আর বাস্তব জীবনে শুধু অন্যের জন্য বাঁচব, এমন নয়। নিজের জন্মদিন মনে রাখব, নিজের স্বপ্নগুলোকে সবসময় গুরুত্ব দেব। কারণ আমরা শুধু গৃহবধূ নই, আমরাই আমাদের গল্পের নায়িকা!
শিবানী চক্রবর্তী, গুমা, উত্তর ২৪ পরগনা
নারীকে সম্মান দিন নারীও
নারীদিবসের জন্য লিখতে বসে প্রথমেই পাঠকদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। নারীদিবস কেন? নারী তো চারিত্রিক, বৌদ্ধিক কোনও শক্তিতেই পুরুষের থেকে কম নয়, তবে কেন শুধুমাত্র বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে আলোচনাসভার মাধ্যমে নারীদিবস উদ্যাপন করে তাকে অসম্মান করা! নারীকে প্রাথমিকভাবে তার যোগ্য সম্মান দিতে পারে একজন নারী-ই। একই মাতৃগর্ভ থেকে পুরুষ ও নারীর জন্ম। মা যদি তার আত্মজকে আদর্শ সন্তানরূপে গড়ে তুলতে পারে, তবেই সে তার মাতা, ভগিনী, কন্যা ও প্রিয়াকে যথাযোগ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে শিখবে। প্রথম জীবনে মেয়েরা বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে সম্মান ও সহযোগিতা পায় বলেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহীয়সী নারীদের আবির্ভাব ঘটে। পরবর্তীকালে, বিবাহোত্তর জীবনে নারীরা ভাস্বর হয়ে উঠতে পারে একমাত্র তার জীবনসঙ্গীর আন্তরিক সহযোগিতা, সমর্থন ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়নে। কাজেই প্রতিটি নারীর সাফল্যের মূলে একজন উদারমনস্ক পুরুষের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান সমাজে নারীদের অবস্থান অনেক বদলেছে। আজ তারা পরিবারের সমর্থন ও সহযোগিতায় নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধিতে বলীয়ান হয়ে কর্মক্ষেত্র ও সংসার দুই-ই সামলাচ্ছে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমি বিবাহোত্তর জীবনে উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। তা সত্ত্বেও স্বজনদের দ্বারা চরমভাবে উপেক্ষিত, বাধাপ্রাপ্ত ও অসম্মানিত হয়েছি। সেসব বাধা পেরিয়ে আমি সফল কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সুখী সংসার-জীবন কাটাচ্ছি।
তাই বলব, জীবনে অনেক কিছু পাইনি ঠিকই, কিন্তু পেয়েছি তার চাইতেও অনেক বেশি।
তনিমা গোস্বামী (রায় চৌধুরী), সোদপুর, কলকাতা ১১০