


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: তারাতলা-বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা ১৬ ছুঁয়েছে। এখনও বহু মানুষ আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। বহু পরিবারের মাথার উপর যেন বজ্রাঘাত নেমে এসেছে। উপার্জনের মানুষটাই আর নেই। এই অবস্থায় কিছুটা ভরসা জুগিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা করা ক্ষতিপূরণ। কিন্তু অভিযোগ, তা পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
রানিগঞ্জের লায়েক বাঁধের বাসিন্দা নবীন সিং পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য ছিলেন। বাড়িতে রয়েছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী ও তিন নাবালক সন্তান। রোজগারের জন্য কলকাতার তারাতলায় গুদাম নির্মাণের কাজে গিয়েছিলেন নবীন। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে কংক্রিট-লোহার ধ্বংসস্তূপের তলা থেকে উদ্ধার হয়েছে নবীনের নিথর দেহ। তাঁর অকাল মৃত্যুতে ভয়ানক পরিস্থিতির মুখে গোটা পরিবার। অবশ্য তাঁদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করা ক্ষতিপূরণের ১০ লক্ষ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ। মোট ১২ লক্ষ টাকা হাতে পাওয়ার কথা তাঁদের। কিন্তু মৃতের পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের জেলা প্রশাসন ফোন করে জানিয়েছে, চার লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মিলবে। এরপর চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন নবীনের বাবা ও স্ত্রী।
স্ত্রী নেহা সিং বলেন, ‘শুনেছিলাম প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী ১২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসনের নাম করে আমাদের কাছে ফোন এসেছিল। ফোনে বলেছে, ৪ লক্ষ টাকা দেবে। আমাদের কাছে নথি চেয়েছিল। আমরা নবীনের আধার কার্ড পাঠিয়েছি। ক্ষতিপূরণের সব টাকা তাড়াতাড়ি পেলে উপকৃত হব।’ এক শীর্ষকর্তা জানিয়েছেন, সমন্বয়ের অভাবে এমন হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ঘোষণা মতোই ক্ষতিপূরণ মিলবে। পাশাপাশি রানিগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক পার্থ ঘোষ বলেছেন, ‘উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি ওঁদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকেও বিষয়টি জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসন তাঁদের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করেছে। সরকারের তরফে যে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেটাই পাবেন।’
তারাতলায় দুর্ঘটনা ঘটার ক’দিন আগে নবীন স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কাঠামোর গোটাটাই নড়ছে। কাজের সময় ভয় করে।’ তবে ভয় করলেও ফেরার উপায় ছিল না নবীনের। তাঁর পাঠানো টাকায় চলত সংসার। নবীনের সেই কথা এখনও কানে বাজে স্ত্রীর। দুই নাবালক ছেলের কথা ভেবে স্বামী হারানোর শোক চেপে রেখেছেন। তার মধ্যেই সরকারি ক্ষতিপূরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। টাকার পরিমাণ নিয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য নেহার উদ্বেগ বাড়িয়ে গিয়েছে বহুগুণ।
অন্যদিকে, মাথার উপর ছাদ থাকবে কি না, সে বিষয়টিও ভাবাচ্ছে নেহাদের। লায়েক বাঁধ এলাকায় এক খণ্ড জমির উপর ছোটো একটি টালির বাড়ি তাঁদের। সম্প্রতি ওই এলাকায় উচ্ছেদের নোটিস সাঁটিয়েছে রেল। নেহাদের বাড়িও সেই তালিকায় রয়েছে।
সিটু নেতা উমাপদ গোপ বলেন, ‘বেআইনিভাবে রেল নোটিস ধরিয়েছে। শুধু নবীন সিংয়ের পরিবারই নয় এখানকার সব গরিব পরিবারের মাথার ছাদ কেড়ে নিতে চাইছে রেল। জমির মালিক বেঙ্গল কোল। তারা বার্নস কোম্পানিকে লিজ দিয়েছিল। রেল উচ্ছেদের নোটিস দিতেই পারে না। আমরা আন্দোলনে নেমেছি।’