


কলহার মুখোপাধ্যায়: কলকাতার দুর্গাপুজো নিয়ে কথা উঠলে সাধারণত চোখে ভাসে বিশাল মণ্ডপ, কোটি টাকার বাজেটের চকচকে থিম, চোখধাঁধানো আলো, তারকাখচিত উদ্বোধন। প্রচারের আলোর নীচে সেই পুজোগুলিই থাকে। কিন্তু কলকাতায় আরও কিছু দুর্গাপুজো আছে, যাদের আলো নরম, মণ্ডপ ছোটো, বাজেট কমের থেকেও কম। সে পুজোয় স্পনসর নেই। বিজ্ঞাপনের বড়ো ব্যানার নেই। কর্পোরেট অনুদান নেই। কোনো কোনো বছর চাঁদার টাকাও যথেষ্ট ওঠে না।
তবু পুজোগুলি হয়।
জাঁকজমক থেকে দূরে থেকে মৃদু, নরম আলোয় মেখে, স্মৃতিমেদুর অভিজ্ঞতায় ঘেরা সে পুজো হয়ে চলেছে কোথাও ১০০, কোথাও পঞ্চাশ-ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে। অর্থাৎ কোনো মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ সে পুজোর যাত্রাপথ। কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি সে পুজোয় জড়িয়ে।
সে পাড়ার কেউ নিজের পকেট থেকে টাকা দেন। কেউ পুরানো সঞ্চয় ভাঙেন। কেউ বলেন, ‘এবার অবস্থাটা ভালো যাচ্ছে না রে, হাজার দু’য়েকের বেশি পারব না।’ কেউ টাকা দিতেও পারেন না। কেউ যান নিজের টাকায় ফুল কিনতে, কেউ দেন ভোগের চাল, কেউ মূর্তি আনার গাড়ির ব্যবস্থাটা নিজে থেকেই করে ফেলেন। সেখানে টাকার পরিমাণ কম। সেখানে মানুষের অংশগ্রহণই পুজোর মূলধন।
এ নিছক কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয়। কলকাতার সোঁদা গন্ধমাখা পুরানো গলিঘুঁজিতে ঘুরলে এ পুজোর দেখা মেলে। যেখানে প্রণাম করার পর কিছু না থাকলে একটি বাতাসা হয়তো হাতে তুলে দেন পাড়ার কোনো মাসিমা বা কাকিমা।
এ পুজো বন্ধ করা হয় না। করা যায় না। আন্তরিকতার অসীম সমুদ্রে ডুবে সে পুজোর মনের টান ঝিনুকের মুক্তোর মতো ঝকঝক করে। কলকাতার নাকছাবিতে সে মুক্তোর ঔজ্জ্বল্য কোনোকিছুতেই ম্লান হয় না। অনেক বাহারি থিম, দামি আলোর থেকেও তা বেশি উজ্জ্বল। ফোকাসের স্পট লাইট তার উপর পড়ে না বটে, তবে সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্রের, হাতেগোনা কিছু টিউব-বাল্ব-হ্যালোজেনে, পাড়ার মানুষের অনাবিল আদরে সে পুজো এক অপার্থিব মোহময় আলোয় মোড়া। তা জন্মের পর থেকেই মা-মাসিমা-কাকিমা-জেঠিমা-দাদু-দিদা-ঠাকুমার আদরে বেঁচে আছে। বয়স তার বাড়ে বটে তবে আদর কমে না। দুর্গা যেমন ঘরের মেয়ে হয়েই আজন্মকাল আসে। আদর পায়। এ পুজোও তেমন পাড়ার সকলের সন্তানসম হয়ে আদরের খানিকটা ভাগ নিজেও পেয়ে যায়। তাই শত অভাবের মধ্যেও মনের টানের পুজো হয়ে চলে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তার প্রদীপ একদিনও নেভে না।
শ্যামপুকুরে যেখানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বাড়ি সেখানকার একটি পুজোর এক
উদ্যোক্তা বলেছিলেন, ‘আমাদের পুজো শতাধিক বছরের পুরানো। কিন্তু কোনো স্পনসর পায় না। মাসে মাসে আমরা টাকা জমাই। আর কিছু চাঁদা তুলি। তা দিয়েই পুজো করি। কোনোভাবেই টাকার অভাবে পুজো বন্ধ করার কথা কোনোদিন মাথায় আসেনি। আমাদের বাবা-কাকারাও কোনোদিন ভাবেননি, ঠাকুরদারাও ভাবেননি।’
‘যেভাবেই হোক, পুজো বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না,’ শ্যামপুকুরের মতো
জেদই কলকাতার এইসব পুজোর মূলধন। তা গভীর, মানবিক, আন্তরিক, স্বতন্ত্র।
কোনো কোনো পাড়ায় পুজোর বাজেট কয়েক লক্ষ টাকাও নয়। কোথাও ডেকরেটরের গতবছরের ধার এখনও শোধ হয়নি। মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক বেড়েছে বলে মণ্ডপ ছোটো হয়েই চলেছে। আলোর বাহার কমেছে, প্রতিমার সাজে কাটছাঁট হয়েছে। এরকম এক পুজোর সম্পাদক বলেছিলেন, ‘সরকারি অনুদানই তাঁদের মতো পুজোর বড়ো সহায়।’
এরকম পাড়ার কয়েকজন কর্মকর্তা শরৎ এলেই হিসাব কষতে বসে পড়েন, কীভাবে এ বছর উতরে দেওয়া যায় তার ভাবনায়।
আধুনিক নগরজীবনে যেখানে বহু সম্পর্কই ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সেখানে এই পুজোগুলি সমষ্টিগত ঐতিহ্যের কথা বলে। পুজোগুলি এখনও মানুষকে মনে করায়, পাড়া মানে শুধু পাশাপাশি থাকা কয়েকশো বাড়ি বা লম্বা ফ্ল্যাট নয়, পাড়া মানে সবার সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করে থাকা, পরস্পরের জন্য কিছু করার সামাজিক দায়বদ্ধতা।
পুজোর আগে তাই দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের সামান্য পেনশন থেকেও টাকা দিচ্ছেন। বলছেন, ‘আমার বাবাও টাকা দিতেন।’ এই একটি বাক্যের মধ্যে তিন প্রজন্মের ইতিহাস ঢুকে গেল। ছোটো কোনো দোকানদার কাকু বলছেন, ‘এ বছর বেচাকেনা ভালো যাচ্ছে না, তবু দেখি, কতটা দিতে পারি।’ বিদেশে চাকরি পেয়েছে চক্রবর্তী বাড়ির ছোটো ছেলে। সে অনলাইনে টাকা পাঠাচ্ছে। বহু বছর আগে বাড়ি করে পাড়া ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মিত্র কাকু-কাকিমা। পুজোর আগে ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘হ্যাঁ রে পুজো হচ্ছে? কত টাকা দিতে হবে বললি না তো।’ এ প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বছর বছরের সম্পর্ক মুক্তোর মতোই ঝকঝক করে। এই পুজোগুলির স্পনসর না পাওয়া কখনো অভাবের গল্প বলে না। এখানে জয় নেই। পরাজয়ও নেই। এখানে যেহেতু টাকার চেয়ে বড়ো সম্পর্ক, তাই দায়িত্ব আর দায়বদ্ধতাই মূলধন।
বড়ো বাজেটের পুজোয় যেখানে ব্যানার টাঙানোর জায়গা নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে এই ছোটো পুজোয় আলোচনা হয়, প্রতিমার টাকা কে দেবে। পুরোহিতের দক্ষিণা কীভাবে হবে। ভোগের চাল কোথা থেকে আসবে। আলো কতটা কমানো যায়। কেউ নিজের দোকানের সামান্য উপকরণ দিয়ে সাহায্য করলেন। কেউ বাড়ির ভাঁড়ার থেকে বের করে দিলেন আতপ চাল-ডাল। এই দেওয়া-পাওয়ার মধ্যে কোনো কর্পোরেট হিসাব থাকে না। যেটা থাকে সেটা হল আত্মীয়তা। আর আত্মমর্যাদা। তাই এ পুজোর মূল্য বাজেটের অঙ্কে মাপারও উপায় নেই।
তাঁদের মণ্ডপ সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা পাবে না। তাঁদের প্রতিমা পুরস্কার পাবে না। তাঁদের উদ্বোধনে কোনো বিখ্যাত অভিনেতা আসবেন না। কিন্তু অষ্টমীর সন্ধ্যায় পাড়ার নতুন দাদু লাঠি হাতে এসে বসবেন। ছোটোবেলার স্মৃতি ঠোঁটে হাসি ফোটাবে গম্ভীর মানুষটির। তাঁর চোখে তখন ছোটোবেলার সেই আলো। যে আলো কোনো স্পনসরের টাকায় কেনা সম্ভব না। তাই স্পনসর না পাওয়া পুজোগুলির গল্পকে আর্থিক দুর্বলতার মাপকাঠিতে মাপলে ভুল হয়। এগুলি একটি মধ্যবিত্ত পাড়ার মানসিক দৃঢ়তার গল্প শোনায়। মানুষ সেখানে নিজের পকেটের শেষটুকু দিয়েও বলেন, ‘পুজো এবারও হবে।’
এই একটি বাক্যের মধ্যে অর্থনীতির সমস্ত অঙ্ক যায় হার মেনে। কেন দেন তাঁরা নিজের রক্তজল করা টাকা? এ প্রশ্নের উত্তরও অর্থনীতির বইয়ে নেই।
অবসরপ্রাপ্ত বলেন, ‘বাবার সঙ্গে চেয়ার পাততে আসতাম।’ গৃহবধূ বলেন, ‘মা যতদিন বেঁচেছিলেন অঞ্জলি দিতে আসতেন।’ বিদেশে থাকা বড়ো চাকুরিজীবী বললেন, ‘পুজোর জন্যই তো ছোটোবেলার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা হয়।’ শিক্ষক বলেন, ‘পুজো বন্ধ যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। তা হলে পাড়াটা আর পাড়া থাকবে না, বুঝলি।’
এই ‘পাড়া’ শব্দটির গুরুত্বই এখনকার নাগরিক জীবনে বেশি শোনা যায় না।
একই বহুতলে থাকা মানুষ পরস্পরের নাম জানেন না। একই রাস্তায় বসবাস করেও পাশের বাড়ির মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় না। অথচ একটি ছোটো পুজো চার দিনের জন্য হলেও মানুষকে এক করে। যে মানুষটি আজ সভাপতি, ছোটোবেলায় তিনিই বাবার হাত ধরে মণ্ডপে চেয়ার সাজিয়েছিলেন। যে তরুণ আজ চাঁদা তুলছে, তার বাবা একদিন এই পাড়ায় চাঁদার খাতা হাতে ঘুরেছেন। এ পুজো তাই শুধু চারদিনের কোনো অনুষ্ঠান নয়। তা চলতে থাকা স্মৃতির ধারাবাহিকতা। সেই ধারাবাহিকতা থেমে গেলে শুধু প্রতিমার বিসর্জন হয় না, একটি পাড়ার স্মৃতিরও বিসর্জন ঘটে।
এখনও সে পাড়ায় চাঁদার খাতা হাতে ঘুরতে হয় কিশোরদের। মণ্ডপ বাঁধতে গিয়ে বন্ধুত্ব হয় যুবকদের। ভোগ রান্না করতে গিয়ে অন্যবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় নতুন বউয়ের। এক পুজো তাঁদের গোটা এক জীবনকে বেঁধে দেয় স্নেহেন বন্ধনে।
ছোটো পুজো যখন অর্থের অভাবে থমকে যায়, তখন সেটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়, একটি সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। দুর্গার কাছে বাজেটের কোনো অঙ্ক খাটে না।
মানুষ জানেন, তিনি যে টাকা দিচ্ছেন তার কোনো আর্থিক প্রত্যাবর্তন নেই। পুজো তাঁকে লাভ দেবে না। কোনো ব্যবসায়িক প্রচার হবে না। সে টাকা রিটার্ন হয়ে ফিরে আসবে না। যে বৃদ্ধ সদস্যটি চাঁদা দেন তিনি হয়তো জানেন না আগামী বছর ইহজগতে থাকবেন কি না। তবু দেন। কারণ তাঁদের কাছে এই চাঁদা আসলে উমার কাছে রাখা নিজের জীবনের একটি ছোটো অংশ। কলকাতার বড়ো পুজোর সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ছোটো পুজোগুলির ভিত লুকিয়ে সম্পর্কের মধ্যে। এর মধ্য থেকেই তৈরি হয় সামাজিক আত্মীয়তা, তার সরকারি নথি নেই, কর্পোরেট রিপোর্ট কার্ড নেই, কিন্তু এর অস্তিত্ব সমাজের গভীরে প্রোথিত।
দুর্গা তাই নিয়ম করে এখানেও আসেন। সে ঘর শত অভাবেও দরজা খুলে রাখে। বলে, ‘এস মা। ধুয়ে মুছে তকতকে করে রেখেছি ঘর। তোমার আসনই পেতে চলেছি একজীবন ধরে।’