


মহারাজ: নেতার অভাব সর্বত্র। গোটা ভারতবর্ষে নেতা নেই। আমাদের দেশে নেতারা অন্যদের চাকর মনে করে। সবাইকে দেখে, সবার সঙ্গে পরামর্শ করে যে কাজ করা, তা যেন তাদের কুষ্ঠিতে নেই—কেবল আড়ালে নিন্দা করবে। স্বামীজী বারবার জোর দিয়েছেন practical wisdom-এর ওপর। কাজ করে অভিজ্ঞতা না হলে এই wisdom আসে না। মুর্শিদাবাদে এসে আমার চোখ খুলে গিয়েছে। সব কেবল ‘নড়িসনে-চড়িসনে, ঘরে বসে থাক’ গোছের! ফলে বেশিরভাগই দরকচা মেরে যায়। মা কী সাধে বলেছেন—‘বাবা, কাজ লক্ষ্মী।’ কাজে মানুষ করিতকর্মা হয়, ছিটগ্রস্ততা কমে যায়। বড় বড় জমিদার বসে বসে খায়, আর নিষ্কর্মা হয়ে যায়—সংসারে অনভিজ্ঞ, অপটু। কোনো এক বিশিষ্ট ভদ্রলোকের বাড়িতে চাকর বাজার করত, যা-তা আনত, তা-ই খেতে হতো। আমার সঙ্গে মিশে এখন তিনি নিজে কাঁধে করে থলে আনেন। তাঁর ছেলেকে স্কুলে পাঠাতেন, চাকর পেছনে বই নিয়ে যেত। ছেলেটাকে খাইয়ে খাইয়ে এমন করেছিলেন যে, অসুস্থ হয়ে ৬ মাস শুধু বার্লি খেতে হয়েছিল। শুধু ডালডা খাওয়াতেন—জানতেন না যে ডালডা খারাপ। দেখ, তোমাদের একটা খুব জরুরি কথা বলব। যদি রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী হতে চাও তবে ৩টে/সাড়ে ৩টেয় ওঠার অভ্যাস করো। আমাদের তো সহজে ‘আমি’ যায় না। ঘুরে ফিরে ‘আমি এই পাস’, ‘অমুক বাড়ির ছেলে’ এসে পড়ে। এসব ভুলতে গেলে আত্মবিকাশ চাই। শুধু academic হলে, কেবল পড়ছে আর পড়ছে—এতে কি উন্নতি হয়?
সেবক: মহারাজ, আমাদের কি ধ্যানযোগ অভ্যাস করা উচিত?
মহারাজ: শুধু রাজযোগ অভ্যাস করলে প্রাণের ওপর প্রচুর control আসে; ফলে সে একইসঙ্গে পাঁচটি পৃথক পৃথক কায় ধারণ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো—দেহের বাইরে যাওয়া নয়, দেহের মধ্যে থেকে ভোগ করা। মুমুক্ষু দেহের পারে যাবে—তাকে চারটি কোষই ছাড়তে হবে। আমাদের খুব বেশি austerity ভাল নয়। তাই মধ্যপন্থা। আমি যেখানে আশ্রম শুরু করেছিলাম সেখানে একসময় সাত হাতি কাপড় পরতাম; তারপর ভদ্রলোকের ছেলেরা এলে চৌকির ব্যবস্থা হলো—বাঁশের বদলে কাঠের বাড়ি হলো। সেখানে মেয়েমানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবে বাইরের লোক এলে আমি একটা ঘরে বসে তাদের সঙ্গে আলাপ করতাম। ব্রহ্মচারীরা মিশতে পারত না। আমাদের মিশনে এই যে অবাধ গতি—এর একটা সুফলও আছে। পুরোনো সব মঠে যেসব অন্যায় কর্ম হতো, শুনলে কানে আঙুল দিয়ে পালাবে। এখানে সবার সামনে চলতে ফিরতে হয়, তাই সবাইকে সংযত থাকতে হয়।
স্বামী সুহিতানন্দ সঙ্কলিত ও সম্পাদিত ‘সারগাছির স্মৃতি’ থেকে