


পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: ২৬ জানুয়ারি ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবস। কিন্তু এই গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল বছরের পর বছর ধরে চলা বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। বীরভূমের রাঙামাটি যেমন লোকসংস্কৃতির জন্য পরিচিত, তেমনই এই মাটি সাক্ষী হয়ে আছে ব্রিটিশ বিরোধী তীব্র লড়াইয়ের। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মানচিত্রে বীরভূম জেলা কেবল এক নীরব দর্শক ছিল না, বরং ১৮৫৫-র সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, প্রতিটিতেই এই জেলা ছিল ব্রিটিশ শাসনের ত্রাস।
বীরভূমের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ১৮৫৫সালে সিধো-কানহো, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সাঁওতাল বিদ্রোহের কেন্দ্রভূমি সাঁওতাল পরগনার পাশাপাশি হয়ে উঠেছিল এই জেলার উত্তর-পশ্চিম অংশ। সিউড়ি শহর সহ জেলার বিস্তীর্ণ অংশ ব্রিটিশমুক্ত করার সেই লড়াই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম বড় গর্জন। পরবর্তীকালে এই জেলার সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামে শামিল হন প্রখ্যাত সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পাশাপাশি কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায়, জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল দাশগুপ্ত এবং জগদীশ ঘোষের মতো শতাধিক বিপ্লবী বীরভূমের মাটিকে বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন।
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বীরভূমে পালিত হয়েছিল ‘অরন্ধন’ ও ‘রাখীবন্ধন’। ১৯২১ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সিউড়ি ও রামপুরহাটে জনসভা এবং ১৯২৫সালে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীর সিউড়ি আগমন জেলাবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। একদিকে যখন শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো নেতারা লবন আইন অমান্য করে কারাবরণ করছেন, অন্যদিকে তখন অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা সশস্ত্র বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করছিলেন।
জেলার বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হল ১৯৩৪ সালের ‘বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা’। সিউড়ি, দুবরাজপুর, লাভপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেলে পুলিশ ৪২ জনকে গ্রেফতার করে। টানা মামলার পর ১৭জন বিপ্লবীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রভাতকুমার ঘোষ, রজতভূষণ দত্তসহ ১০জনকে ‘বিপজ্জনক’তকমা দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে।
১৯৪২সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও বীরভূম ছিল অগ্নিগর্ভ। ১৩ আগস্ট থেকে ছাত্র আন্দোলনের যে ঢেউ শুরু হয়েছিল তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৫আগস্ট। সিউড়ি শহরে শতাধিক বিপ্লবী বীরভূম জেলাকে ‘স্বাধীন’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ১সেপ্টেম্বর দুবরাজপুর আদালতে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল মুক্তিকামী জনতা। সেদিন যে স্পর্ধা বীরভূমের বিপ্লবীরা দেখিয়েছিলেন, সেই স্পর্ধাই আজ আমাদের গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।