


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, রানাঘাট: ঘড়ির কাঁটা বেলা ১২টা ছোঁয়ার আগেই রাস্তাঘাট মোটামুটি শুনশান। নোকারি রোড ধরে কিছুটা এগতে ছোটো কালভার্ট। সেটা পেরলেই সিমেন্টের ঢালাই করা সরু রাস্তা ডানদিকে ঢুকে গিয়েছে কুপার্স ক্যাম্পের দিকে। একসময় ওপার থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে বহু মানুষ চলে এসেছিলেন এপারে। তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে থিতু হন রানাঘাটের এই উদ্বাস্তু কলোনিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য ভোল বদলেছে অনেকটা। গলিপথ ধরে কিছুটা যেতেই চারমাথার মোড়। সেখানে জনা দশ-বারোর জটলা। কিছুক্ষণ আলোচনা শুনে বোঝা গেল, এসআইআরের জন্য এই পাড়ার বেশ কয়েকজনের নাম বাদ পড়েছে। এখন কী করণীয়, তা নিয়েই চর্চা। ক্ষোভের সুরে স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, সব কাগজ থাকা সত্ত্বেও বিজেপি আর কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দিয়েছে। একবার আমরা ভিটেমাটি হারিয়ে এপারে এসেছিলাম। এখন বিজেপি আবার আমাদের উদ্বাস্তু করার চেষ্টা করছে। এবারের ভোটে যাঁরা ভোট দিতে পারবেন না, তাঁদের হয়ে আমরা জবাব দেব।
শুধু কুপার্স ক্যাম্প নয়, রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভাজুড়ে ৭,১২৮ জনের নাম বাদ। মাঝেরগ্রাম, হবিবপুর, রামনগর, আনুলিয়া, তারাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো এলাকায় বিচারাধীন ১৯ হাজারেরও বেশি। মানুষের এই ক্ষোভকেই এবারে ভোটযন্ত্রে টেনে আনতে মরিয়া শাসকদল। এবারের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে চিকিৎসক সৌগত বর্মনকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। রাজনীতিতে নতুন হলেও প্রচার করছেন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদদের মতোই। পায়রাডাঙার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারের ফাঁকে বললেন, ‘এসআইআরের নামে বিজেপি বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সুপ্রিম কোর্টে বাংলার মানুষের হয়ে না লড়তেন, আরও বহু নাম বাদ যেত। আমরা ভোটপ্রচারে সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের পাশাপাশি দিদির এই সংগ্রামের কথাও মানুষকে বলছি। তুমুল সাড়াও পাচ্ছি।’
শাসকদলের প্রার্থী বলে কথা। তাঁর মুখে এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত। কিন্তু আম জনতা কী ভাবছে? আইশমালি এলাকার স্থানীয়রা জানালেন, গত বিধানসভায় মুকুটমণি অধিকারী বিজেপির টিকিটে জিতেছিলেন। ভোট পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ১৯ হাজার ২৬০। আবার কিছুদিন পর তিনিই দল বদলে তৃণমূলে চলে যান। উপনির্বাচনে বড়ো ব্যবধানে জিতলেও তাঁকে এলাকার মানুষ সেভাবে পাননি। সেই জন্যই বোধহয় এবারে তাঁকে আর টিকিট দেওয়া হয়নি। ডাক্তারবাবুকে (সৌগত) আমরা বহু বছর ধরে চিনি। উনি জিতলে এলাকার ভালো হবে। বোঝা গেল, বিদায়ী বিধায়ক নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও প্রার্থী বদলে মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন মমতা-অভিষেক।
গত উপনির্বাচনে এই কেন্দ্রে মনোজকুমার বিশ্বাসকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি। ৭৪ হাজার ভোট পেলেও এবারে এই কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করেছে পদ্মশিবির। টিকিট পেয়েছেন চাকদহের বাসিন্দা অসীম কুমার বিশ্বাস। তারপরই প্রার্থী বদলের দাবিতে জেলা পার্টি অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখান দলীয় কর্মীদের একাংশ। সেই ক্ষোভের আঁচ রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। গত বিধানসভা নির্বাচনে নপাড়া মাসুন্দা, হিজুলি থেকে ভালো ভোট পেয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী। এবারে কি তার পুনরাবৃত্তি হবে? এলাকায় বিজেপি সমর্থক বলে পরিচিতদের প্রশ্ন, আমাদের এই বিধানসভা এলাকা থেকে কি কোনো কেউ প্রার্থী হওয়ার মতো ছিলেন না? বাইরে থেকে কেন প্রার্থী আনতে হল? ভোটে এই সিদ্ধান্ত ব্যুমেরাং হতে পারে। বিজেপি প্রার্থী অসীমকুমার বিশ্বাস অবশ্য গোষ্ঠী কোন্দলের দাবি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আমরা একজোট হয়ে লড়াই করে আবার এই কেন্দ্রে জিতব।’ যদিও গেরুয়া শিবিরের একাংশের মতে, এবারের লড়াই অত্যন্ত কঠিন। সাংসদ জগন্নাথ সরকার ও প্রাক্তন বিধায়ক মুকুটমণির দ্বন্দ্বে দলে ফাটল ধরেছিল। সেই ক্ষত সামাল দেওয়ার মতো নেতা এই মুহূর্তে দলে নেই।
এই আবহে রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভায় মাটি শক্ত করতে ঝাঁপিয়েছে সিপিএমও। গত উপনির্বাচনের পর এবারও অরিন্দম বিশ্বাসকে প্রার্থী করেছে বাম শিবির। এবারের ভোটে মানুষ বামেদের পাশে এসে দাঁড়াবেন বলে আশা ভূমিপুত্র অরিন্দমের। কোন অঙ্কে জয় দেখছে সিপিএম। বাম শিবিরের দাবি, এসআইআর নিয়ে মানুষ প্রবল ক্ষুব্ধ। কোভিড থেকে এখনও তাঁরাই মানুষের পাশে রয়েছেন। কুপার্স ক্যাম্প সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় এখনও মানুষ লাল পতাকাকে ভরসা করে। ২০ বছর পর ২০২৩ সালের ভোটে আইশমালি পঞ্চায়েত সিপিএমের দখলে এসেছে। ভোট ময়দানে ছুটছেন কংগ্রেস প্রার্থী রীতা পাল দাসও। যদিও পায়রাডাঙা অঞ্চলের কিছু পকেট ভোট ছাড়া কংগ্রেস প্রার্থীর বাড়তি ভোট পাওয়ার আশা কম।
রানাঘাট দক্ষিণ আসনের একটা বিশেষত্ব আছে। ২০১১ সাল থেকে প্রতিবার ভোটে এই কেন্দ্রে কোনো একটি দল পর পর দু’বার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। রাজ্যে পালাবদলের আবহে এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন তৃণমূলের আবীর বিশ্বাস। ২০১৬ সালে প্রবল ঘাসফুল হাওয়ার মধ্যে এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন সিপিএমের রমা বিশ্বাস। ২০২১ সালে জিতেছিল বিজেপি। তিন বছর পরে উপনির্বাচনে ফের ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল। এবারের ভোটে সেই ট্র্যাডিশন ভেঙে ইতিহাস গড়তে মরিয়া তৃণমূল।