

ইন্দ্রজিৎ সেন, কলকাতা: ইতিহাস ছোটবেলায় পড়তে যতটা বিরক্ত লাগত, বড় বেলায় ঠিক ততটাই আগ্রহ জাগে ইতিহাস জানতে। ইতিহাসের জীবন্ত দলিল আমাদের কলকাতা। কোণায় কোণায় লুকিয়ে আছে অনেক না জানা ইতিহাস। কলকাতার ইতিহাস শুধু রাজপথ, প্রাসাদ কিংবা স্মৃতিসৌধে লেখা নেই। এই ইতিহাসের কিছু অধ্যায় লেখা আছে কলকাতার পুরনো কবরস্থানগুলিতেও। সেই কবরস্থানগুলির মধ্যে পার্কস্ট্রিটের চেনা কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সাউথ পার্কস্ট্রিট সেমেট্রি যেন একটু বেশিই নজর কাড়ে । কাড়বে নাই বা কেন? এই কবর স্থানে প্রবেশ করা মাত্রই সব কিছু যেন এক নিমেষেই বদলে যায়। পালটে যায় শহরের চেনা ছবিটাই। ১৭৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সমাধিক্ষেত্র শুধু মৃত মানুষের শেষ ঠিকানা নয়। এটি ঔপনিবেশিক কলকাতার জন্ম, বিস্তার এবং সামাজিক ইতিহাসের এক নিদর্শন। এই কবরস্থানে রয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম জোনস, ডিরোজিও সহ বেশ কিছু গুনী ইংরেজদের সমাধি। কিন্তু এই সমাধিগুলি দেখতে দেখতে এক জায়গাতে গিয়ে পা থমকাবেই। হঠাৎ নজরে পড়ে একটি অনন্য সমাধি। সমাধি বলা ভুল, বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলে এটি ব্রিটিশদের সমাধির থেকে একটি হিন্দু মন্দিরই বেশি মনে হয়। সমাধির গায়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, মন্দিরের গম্বুজ পদ্মফুলের ন্যায়। এখানেই মনে দানা বাঁধে একাধিক প্রশ্ন। এই খ্রিষ্টান সমাধির ভিতরে কেন এই হিন্দু মন্দির? কার সমাধি এটি? আরও অবাক লাগে যখন এই মন্দির সদৃশ সমাধির গায়ে একাধিক হিন্দু দেবদেবীর মূর্তির দেখা মেলে। সমাধি ফলকটি দেখলে জানা যায় এইটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্টের সমাধি। এবার প্রশ্ন তিনি কে? কেন তাঁর সমাধি হিন্দু মন্দিরের আদলে তৈরি?
উপরের প্রশ্নের উত্তর পতে টাইম মেশিনে আমাদের ফিরে যেতে হবে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়। কলকাতা তখন ব্রিটিশদের অধীনে। সে সময় ধুতি পরিহিত এক শেতাঙ্গ সাহেব চললেন গঙ্গা স্নান করতে। কিছুটা অবাক হয়ে দেখছেন আশে পাশের মানুষ। আসলে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেউ চোখ ফেরাতে পারছেন না। এ যেন উল্টো পুরাণ। যেখানে ভারতীয়রা ব্রিটিশ সাহেবদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সেখানে ব্রিটিশ হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে আবাক অনেকেই। সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, কৃষ্ণপ্রেমী এই সাহেব কে? কৌতুহলে জানা যায় তিনি আর কেউ নন বরং তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল চার্লস স্টুয়ার্ট। শুধু গঙ্গা স্নান না, রীতিমতো মন্দিরে পুজো দেওয়া। কৃষ্ণমূর্তি নিয়ে গঙ্গায় ডুব দেওয়া থেকে আরও কত কী। সাহেবদের কাছে তিনি শেষ পর্যন্ত পরিচয়ই পেলেন 'হিন্দু স্টুয়ার্ট' নামে। ভারতীয় দেবদেবীদের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে অন্যান্য ব্রিটিশদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল।
আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া স্টুয়ার্ট অল্প বয়সেই ভারতে আসেন এবং জীবনের বড় অংশ কাটান এই দেশেই। ভারতীয় ভাষা, পোশাক, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে সমসাময়িক বহু ইউরোপীয়ের থেকে আলাদা করেছিল। কলকাতায় তিনি নিয়মিত গঙ্গায় স্নান করতেন এবং হিন্দু সংস্কৃতির নানা রীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। হিন্দু স্টুয়ার্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন ভিডিওতে....