


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: রি-ক্যাপ ২০১০ সাল। হাওড়ার প্রভু জগৎবন্ধু কলেজের মনোনয়ন নিয়ে এসএফআই ও তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। প্রাণ হারান কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র তথা এসএফআই সদস্য স্বপন কোলে।
২০১২ সাল। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি ঘিরে হামলা চালায় বহিরাগতরা। তৎকালীন অধ্যক্ষ দিলীপ দে সরকারকে তাঁর চেম্বার থেকে টেনে বের করে বেধড়ক মারধর করা হয়।
২০১৩ সাল। গার্ডেনরিচের হরিমোহন ঘোষ কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে হিংসার বলি হন কলকাতা পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর তাপস চৌধুরী। ওই বছরই প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বেকার ল্যাবরেটরিতে তাণ্ডব চালায় বহিরাগতরা।
২০১৫ সাল। সবং সজনীকান্ত মহাবিদ্যালয়ে কলেজের ভিতরে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্র পরিষদ কর্মী কৃষ্ণপ্রসাদ জানাকে।
সহজ প্রশ্ন, জানা উত্তর
ক্যাম্পাস রাজনীতি ঘিরে একের পর এক রক্তক্ষয়ী হিংসা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনকে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত করে। ফলে ২০১৩ সাল থেকে রাজ্য প্রশাসন অরাজনৈতিক ‘ছাত্র কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলতে শুরু করে। পাশাপাশি, শুরু হয় ছাত্রভোট স্থগিত করার প্রক্রিয়া। ২০১৭ সালের পর থেকে রাজ্যের সিংহভাগ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল—যে রক্তপাত ও ‘লুম্পেনরাজ’ রোখার দোহাই দিয়ে গত সাত-আট বছর ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখা হল, তা কি আদতে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ও গণতন্ত্র ফেরাতে পেরেছে? নাকি উলটে লাগামহীন অরাজকতা আরও বড়ো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে!
বিরোধীশূন্য রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৬-১৭ সাল পর্বটি একটি অন্ধকারময় অধ্যায়। সেই সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাজ্যের সাড়ে চারশোটিরও বেশি কলেজের অর্ধেকেরও বেশি জায়গায় বিরোধী সংগঠনগুলিকে (এসএফআই, সিপি, এবিভিপি) মনোনয়নপত্রই জমা দিতে
দেওয়া হয়নি। বহু জায়গায় ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ শাসক দলের ছাত্র সংগঠন জয়লাভ করে। পরবর্তীতে দলীয় কোন্দল সামলাতে না পেরে তৎকালীন রাজ্য সরকার কার্যত রণে ভঙ্গ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ছাত্রভোট বন্ধ করার ‘সহজ’ কিন্তু ‘ক্ষতিকারক’ পথটি বেছে নেয়।
এখন প্রশ্ন হল, ক্যাম্পাসগুলিতে অপরাধ দমন ও হিংসা সামলানোর দায়িত্ব কার ছিল? নিঃসন্দেহে রাজ্য প্রশাসনের। সেখানে হিংসা রুখতে না পেরে ভোট বন্ধ করে দেওয়া সরকারের চরম ব্যর্থতার নিদর্শন। হিংসার ভয়ে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা কোনো সভ্য সমাজের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
প্রাক্তনী-বহিরাগতদের দাপট
দীর্ঘদিন ছাত্রভোট না হওয়ায় ক্যাম্পাসগুলিতে কোনো বৈধ ও নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই। ফলে বহু বছর আগে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়া প্রাক্তনী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরাই কলেজ ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক। তাঁরাই এখন ক্যাম্পাসের ভরকেন্দ্র। এঁদের মাধ্যমেই বিভিন্ন কলেজে মাথাচাড়া দিয়েছে ‘থ্রেট কালচার’। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো বা বিরোধী শিবিরের উপর হামলা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর বদলে যদি একটি নির্বাচিত ছাত্র সংসদ থাকত, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বহিরাগতদের এই তাণ্ডব থেকে রক্ষা পেত।
আর্থিক দুর্নীতি
প্রতি বছর ভরতির সময় অধিকাংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের থেকে ‘স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার’ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য
নির্দিষ্ট চাঁদা নেওয়া হয়। সাধারণ নিয়মে, এই বিপুল পরিমাণ টাকার তহবিল খরচ হওয়ার কথা
নির্বাচিত ছাত্র সংসদের পেশ করা বাজেট এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনের মাধ্যমে। কিন্তু গত সাত-আট বছর ধরে কোনো নির্বাচিত সংসদ না থাকায় এই বিপুল টাকার তহবিল কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই।
পাশাপাশি, রাজ্যের বহু সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের জীর্ণ পরিকাঠামো, ক্লাসরুমের অভাব, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও হোস্টেলের দৈন্যদশা স্পষ্ট। ছাত্র ভোট হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অন্তত কলেজ পরিচালন সমিতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির বৈঠকে গিয়ে সরাসরি কর্তৃপক্ষের কাছে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সওয়াল করতে পারত। কিন্তু ভোট না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষার্থীদের জবাব চাওয়ার কোনো গণতান্ত্রিক রাস্তা নেই।
ক্যাম্পাসে নারী সুরক্ষা
শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রী ও মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা আজ অন্যতম বড়ো উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে আর জি কর হাসপাতাল বা দক্ষিণ কলকাতার একটি আইন কলেজে ঘটে যাওয়া নারী নিগ্রহ ও অপরাধের ঘটনা সমগ্র রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ইউজিসির নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অ্যান্টি-র্যাগিং সেল এবং যৌন হয়রানি রুখতে ‘জেন্ডার সেনসিটাইজেশন কমিটি এগেইনস্ট সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ বা ‘ইন্টারনাল কমপ্লেনটস কমিটি’ থাকা বাধ্যতামূলক। এই কমিটিগুলিতে ছাত্রছাত্রীদের নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকাও আইনত আবশ্যক। কিন্তু কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত ইউনিয়ন না থাকলে এই কমিটিগুলিও নিষ্ক্রিয় থাকে বা সেখানে শুধু কর্তৃপক্ষের মনোনীত ব্যক্তিরাই থাকেন। ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ছাত্রীরা ভয় পান। নির্বাচিত ছাত্র সংসদ থাকলে সহপাঠী বা সিনিয়রদের কাছে নিজেদের সমস্যা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন ছাত্রীরা। ক্যাম্পাসের পরিবেশও অনেক বেশি সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল থাকে।
অজুহাতের নাম সেমেস্টার
ছাত্রভোট না করানো নিয়ে পূর্বতন রাজ্য সরকার বিভিন্ন সময়ে ‘সেমেস্টার পরীক্ষা’ বা করোনা মহামারির অজুহাত দিয়েছে। তাদের দাবি, প্রতি ৬ মাসে পরীক্ষা থাকার কারণে নির্বাচনের সময় বের করা কঠিন। যদিও বাস্তবে এই যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ, বাম আমলেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমেস্টার ব্যবস্থা চালু ছিল। তখনও সেখানে নিয়ম করে প্রতি বছর ভোট হত। এখনও অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও সেমেস্টার পদ্ধতিতে পরীক্ষা হয়। তার পরেও সেখানে নিয়মিত ভোট হচ্ছে। যদি সেমেস্টারের মধ্যে বাকি সমস্ত কিছু হতে পারে, তাহলে বছরে মাত্র দু’তিন দিনের মধ্যে ছাত্রভোট করা কী একেবারেই অসম্ভব! আসল কথা হল, পরাজয়ের ভয় এবং ক্যাম্পাসে নিজেদের দলীয় কোন্দল সামলাতে না পেরেই তৃণমূল সরকার ছাত্রভোট বন্ধ রাখার মতো অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
আইন-আদালত
রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় বিষয়টি গড়ায় আদালতেও। সেই সময়ে তৃণমূলের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, রাজ্য সরকার ভোট করাতে তৈরি অর্থাৎ প্রস্তুত ছিল। সার্কুলারও জারি করেছিল। কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিই আগ্রহ দেখায়নি! এমন কথা বললে তো ঘোড়াও হাসবে কত্তা! কারণ, কোনো সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি রাজ্য সরকারের সবুজ সংকেত ছাড়া ভোট করাতে পারেন! যাক সেসব কথা। সওয়াল-জবাব শেষে আদালত নির্দেশ দেয়, যেখানে নির্বাচিত ইউনিয়ন নেই, সেখানে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন রুম তালাবন্ধ থাকবে এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ তা ব্যবহার করতে পারবে না। যদিও বাস্তবে কী হয়েছিল, সেকথা সকলেরই জানা। বঙ্গে পালাবদলের পর খাস কলকাতা সহ একাধিক কলেজের ইউনিয়ন রুমের তালা ভাঙা হয়। দেখা যায়, আদতে সেই ইউনিয়ন রুমগুলিকে নিজেদের ফূর্তির জায়গা বানিয়ে রেখেছিল টিএমসিপির নেতা-কর্মীরা।
বন্ধ সাপ্লাই লাইন
ছাত্র রাজনীতি শুধুমাত্র একটা কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের পথ নয়। এটা আসলে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক ও নেতা গড়ে তোলার প্রাথমিক পাঠশালা। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই পড়ুয়ারা শেখে—কীভাবে বিতর্ক করতে হয়, কীভাবে নীতির লড়াই জিততে হয় বা কীভাবে গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করতে হয়। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী সহ বহু নেতানেত্রী ছাত্র রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সরব হয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও (তিনি নিজেও ছাত্র রাজনীতির ফসল)। কারণ, ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত রাখার অর্থ আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য এবং সুসংগঠিত নেতৃত্ব তৈরির পথকে আটকে দেওয়া।
নজরে যাদবপুর
ছাত্রভোটের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরব যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও। পূর্বতন বা বর্তমান সরকার যাদবপুরকে বারংবার ‘অরাজকতার
আখড়া’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু সত্যি বলতে ছাত্র রাজনীতি কখনোই
সেখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা তাঁদের মেধা ও মননকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শেষ কথা
শিক্ষাঙ্গনকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ করা বা বিরোধীদের দাবিয়ে রাখার জন্য ছাত্র নির্বাচন না করানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রশ্ন করার অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি। তাই পড়ুয়া মহলের আস্থা অর্জন ও পূর্বতন সরকারের অন্ধকার পর্বকে পিছনে ফেলে এগতে হলে বিজেপি সরকারকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ছাত্র নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে হবে। আর কোনো পথ নেই।