


প্রীতম দাশগুপ্ত: মোদি জমানার ১৪ বছরে সবচেয়ে বড় সাফল্য কী? প্রথমটা নিঃসন্দেহে ‘অন্ধভক্ত’ তৈরি করা। আর দ্বিতীয়টি ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই। সেই দ্বিতীয় সাফল্য নিয়েই এবার বিতর্ক শুরু হয়েছে। সৌজন্যে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি নীতি। ইউপিআইয়ের সর্বজনীন ফ্রি ব্যবস্থা থেকে শুল্ক ব্যবস্থায় উত্তরণ। গত ১৪ বছরে শতাধিক আন্তর্জাতিক সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্রেফ আমেরিকাতেই গিয়েছেন ১০ বার। তাবড় রাষ্ট্রনেতাদের গলা জড়িয়েছেন, হাত ধরে ফটো সেশন করেছেন। সোজা কথায় নিজেকে বিশ্বগুরু প্রতিপন্ন করতে চেষ্টার কোনো কসুর করেননি। ভক্তকুলও সমানে ঢাক পিটিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতের কেউ মর্যাদা পেয়ে থাকে, সেটি ইউপিআই। এই ফিনটেক ব্যবস্থাই প্রকৃতপক্ষে বিশ্বগুরু। এবার সেই মর্যাদার ইউপিআই নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশ্বগুরুর মর্যাদা আদৌ আর থাকবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। তার চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা সাধারণ গ্রাহকদের মনে। এবার কি মোবাইল বার করে কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা দিতে বা ইউপিআইয়ে টাকা ট্রান্সফার করতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে?
সম্প্রতি ইউপিআইয়ের ক্ষেত্রে নিয়মে কিছু বদল এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেটি কার্যকর হবে ১৫ অক্টোবর। কী সেই বদল? ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের বাণিজ্যিক (মার্চেন্ট) লেনদেনে ০.৪ শতাংশ এমডিআর ধার্য করা হবে। এখানে বলে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সীমা বা ক্যাপ হবে ৩০০ টাকা। ইউটিলিটি বিল যেমন বিদ্যুৎ, জল ইত্যাদি, টেলিকম এবং জ্বালানির (পেট্রল-ডিজেল) লেনদেনে নির্দিষ্ট ৫ টাকা ফি প্রযোজ্য হবে। শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেনে নামমাত্র ০.০২ শতাংশ চার্জ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, এমডিআর-এর উপরেও চাপানো হবে ১৮ শতাংশ জিএসটি। যদিও এর জন্য খরচ বাড়ার কথা মানতে চায়নি মোদি সরকার। কারণ, সরকারের ব্যাখ্যা, আপাতত এমডিআর-এর উপরে জিএসটি দিতে হলেও ব্যবসায়ীরা ‘ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট’ (আইটিসি) দাবি করে সেই টাকা ফেরত পেতে পারেন। ফলে ইউপিআই লেনদেনের উপরে আদতে তাঁদের কোনো জিএসটি দিতে হচ্ছে না। সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ২০০০ টাকার ঊর্ধ্বে লেনদেন হয়েছে মাত্র চার শতাংশ। কিন্তু যদি বাজার মূল্য ধরেন, তবে দেখবেন, এটি গোটা বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
ছাড় কাদের জন্য? ১) দুই ব্যক্তির মধ্যেকার ব্যক্তিগত লেনদেন ২) ২,০০০ টাকার নীচের লেনদেন এবং ৩) ‘মাইক্রো-মার্চেন্ট’ অর্থাৎ যাদের মাসিক বিক্রি ১ লাখ টাকার কম। এসব ক্ষেত্রে কোনো ফি লাগবে না। অর্থাৎ, পাড়ার মুদি দোকান বা চায়ের দোকানে কিউআর কোড স্ক্যান করে ছোটোখাটো কেনাকাটায় কোনো মাশুল প্রযোজ্য নয়। আপনি আগে যেমন অর্থ দিতেন, তেমনি দেবেন। আবার বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়দের টাকা পাঠানোর বিষয়টাও নিখরচাতেই হবে। কিন্তু যদি দু’হাজার টপকে যায়? সামনেই তো পুজো। জিনিসের যা দাম, তাতে সামান্য কেনাকেটা করলেই তো দু’হাজার টপকে যাবে। আর শপিং মল এখন শুধু শহুরে কালচার নয়। তারপর ধরুন কোথাও দু’তিনজন মিলে খেতে গেলেন। দু’হাজারে হবে? আপনার সন্তানের স্কুলের ফি? সেটাও কি দু’হাজারের মধ্যে? তাই বহু লেনদেনেই ২-৫ টাকা আপনাকে বাড়তি দিতে হবে।
প্রশ্ন হল এমডিআর কী? মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর হল এমন একটি পরিষেবা মাশুল, যা কোনো ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য ব্যবসায়ীকে ওই ব্যাংক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের দিতে হয়। এতদিন সাধারণ ইউপিআই লেনদেনে কোনো এমডিআর ধার্য হত না। যার ফলে ব্যাংক ও ফিনটেক সংস্থাগুলো নিখরচায় এই পরিকাঠামো পরিচালনা করছিল। তা বলে কি পুরো ব্যবস্থা ফ্রি ছিল? মোটেও না। অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের একটা বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, ‘দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ।’ অর্থাৎ, কোনো সুবিধাই বিনা পয়সায় মেলে না। ব্যাংকগুলির ক্ষতিপূরণ হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকার নিজের ভরতুকি প্রকল্প থেকে টাকা দিচ্ছিল। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে এই সহায়তার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, করদাতাদের টাকায় এতদিন এই খরচ সামলানো হচ্ছিল। সরকারের যুক্তি, ইউপিআই-কে করদাতাদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে নিজস্ব আয়ে স্বাবলম্বী বা ‘সেলফ-সাসটেনেবল’ করে তুলতেই এই পদক্ষেপ। সরকার বলেছে এর জন্য ‘গ্রাহকদের কোনো অর্থ দিতে হবে না।’ কিন্তু সরকার বলেনি, গ্রাহককে এর বোঝা বহন করতে হবে না। এই দু’টো বাক্যের মধ্যে কিন্তু একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
সেই কারণে এত কথা উঠছে। অর্থনীতিতেই একটা কথা আছে, ‘কস্ট পাস-থ্রু’ মানে খরচ হস্তান্তরের নিয়ম। যেমন ধরুন এমডিআর বাড়ায় ব্যবসায়ীর খরচ বাড়ল। সে কী করবে? জগতের যা নিয়ম সেটাই করবে। মানে সেই বোঝা গ্রাহকের উপর চাপাবে। প্রথমত পণ্যের দামটা বাড়িয়ে রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত বলতে পারে বাড়তি অর্থ কিন্তু আপনাকেই দিতে হবে। যেমন বহু ছোটোখাটো দোকানে ক্রেডিট কার্ডে জিনিস কিনতে গেলে, তাঁরা আগেই বলে দেয়, বাড়তি টাকা দিতে হবে বা ডিসকাউন্ট কমে যাবে। এবার সেটা বলবৎ হবে ইউপিআইয়ের ক্ষেত্রেও। এছাড়া তাঁরা কী বলতে পারে? প্রথমত নগদ দিন বা দ্বিতীয়ত টাকাটা ভেঙে ভেঙে দিন। যেটাই বলুন, দু’টি ক্ষেত্রেই তো সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কারণ প্রথম সিদ্ধান্ত চালু হলে ডিজিটাল ছেড়ে ফের নগদ অর্থনীতিতে ফেরার ঝোঁক বাড়বে। ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যের দোকানদার-পাম্পমালিকরা বলে দিচ্ছেন, ক্যাশ দিন। আর দ্বিতীয়টি হলে সরকার রাজস্ব হারাবে।
এবার আসা যাক সরকারের খরচের যুক্তিতে। কোনো ব্যবস্থাই চিরকাল ফ্রি থাকতে পারে না। অনলাইন ট্রেডিং ফার্ম জেরোধা একটি সমীক্ষা করেছিল। তাদের রিপোর্ট, ২০২৫ সালে ইউপিআইয়ের মূল প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো পরিচালনার খরচ ছিল মাত্র প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। আইআইএম বেঙ্গালুরুর গবেষকদের বিশ্লেষণ ছিল, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বা এনপিসিআইয়ের পুরো কার্যক্রম পরিচালনায় মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক খরচই ছিল বিপণন বা বিজ্ঞাপন খাতে। বাকি অংশ শুধু ইউপিআই নয়, অন্যান্য পেমেন্ট মাধ্যমের পেছনেও খরচ হয়েছিল। এনপিসিআই কি কোনো লোকসানে চলা সংস্থা? ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষেই সংস্থাটির রেভিনিউ সারপ্লাস ছিল দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। রিজার্ভ ব্যাংক ও কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলি কি লোকসানে চলছে? সেটাও না। ভারত পে’র প্রতিষ্ঠাতা অশনির গ্রোভার আবার বলেছেন, সুভাষ চন্দ্রের মতো ব্যবসায়ীদের আর্থিক ঋণ যদি সরকার মকুব না করত, তবে সেই টাকায় চোখ বুঝে বিনা শুল্কে আরও ২০ বছর ইউপিআই চালানো যেত।
আরও একটু অর্থনীতির কচকচানি করা যাক। ডিজিটাল লেনদেনে সবচেয়ে লাভ কার হচ্ছে? আপনার? না। হচ্ছে বাণিজ্যিক এবং রিজার্ভ ব্যাংকের। কারণ যত বেশি ডিজিটাল লেনদেন তত বেশি কাগুজে নোট ছাপানোর খরচ বাঁচছে। দ্বিতীয়ত ব্যাংকগুলির এটিএম বসানো ও তার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বিপুলভাবে কমে গিয়েছে। গ্রোভারের দাবি, এই সব খাতে ব্যাংকগুলির অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা বছরে ব্যয় হয়। এছাড়া সরকারের রাজস্বও বেশি আসছে। কারণ ডিজিটাল প্রথায় ট্রান্সপারেন্সি অনেক বেড়েছে। ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে একথাগুলি কিন্তু দিনের পর দিন সরকারই বলেছে। ইউপিআইয়ের ১০ বছর পূর্তিতে স্বয়ং মোদি ইউপিআইকে দেশের ডিজিটাল লেনদেন যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাহলে এখন হঠাৎ করে খরচ বেড়ে যাচ্ছে বলে কান্নাকাটির কারণ কী? আর্থিক সাশ্রয় করতে হলে তো নগদ নয়, ডিজিটাল লেনদেনকে আরও উৎসাহিত করা উচিত। ইউপিআই-তে বাধা সৃষ্টি করার কারণটা কী?
এর বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। যেটাকে ব্যালান্স শিটের লাভ-ক্ষতির বাইরে গিয়ে দেখা যায়। ইউপিআই ভারতের জন্য একটি রাজনৈতিক রক্ষাকবচ। আন্তর্জাতিক স্তরে ভিসা, মাস্টারকার্ড বা সুইফ্টয়ের মতো পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে কোনো সময় সংকট ডেকে আনতে পারে। মনে করে দেখুন ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে বিপাকে ফেলতে যাবতীয় আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। সেখানে যদি আমাদের নিজস্ব একটি সার্বভৌম পেমেন্ট ব্যবস্থা থাকে, তবে কেউ চোখ রাঙাতে পারবে না। আমাদের রু-পে কার্ড ও ইউপিআই ব্যবস্থা আদতে এই অর্থনৈতিক ঢাল হিসাবে কার্যকর হচ্ছে।
২০১৬ সালে চালু হওয়া ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল লেনদেন নেটওয়ার্ক। গত অর্থবর্ষেই এই প্ল্যাটফর্মে ২৪ হাজার ১৬২ কোটি লেনদেন হয়েছে। ২০১৬-১৭-রে তুলনায় প্রায় ১৩ হাজার গুণ বেশি। টাকার অঙ্ক ধরলে সেটি প্রায় ৩১৪ লাখ কোটি (প্রায় ৪ হাজার গুণ বেশি)। যার মধ্যে ৫ টাকার চা থেকে শুরু করে ৫,০০০ টাকার অনলাইন কেনাকাটা, সবই নগদহীন পদ্ধতিতে। বিশ্বের ১০-১১টি দেশে ভারতের ইউপিআই চালু আছে। ইউপিআইয়ের এই বিপুল সাফল্যের মূলে ছিল ২০২০ সালে নেওয়া ভারত সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। সেটি হল ব্যবসায়ীদের জন্য ইউপিআই লেনদেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে দেওয়া অর্থাৎ এমডিআর শূন্য করে দেওয়া।
ইউপিআই আজ ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যে মুরগি সোনার ডিম দেয়, বাড়তি লোভে তার পেট কাটলে কী হয়, সেটা তো আমরা জানি।