


পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: গণতন্ত্রের উৎসবের ঢাক বাজছে ঠিকই, কিন্তু সেই বাজনার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সোমবার সকাল থেকেই জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দপ্তরে ভোট নিয়ে ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। সেই ব্যস্ততা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল দপ্তরের বারান্দায় শতাধিক মানুষের লম্বা লাইন। ক্লান্ত শরীরে উদ্বেগভরা চোখে মানুষগুলি শুধু এঘর-ওঘর করছেন একটাই উত্তরের আশায়— ‘নামটা কি আদৌ ভোটার তালিকায় উঠবে?’ হাজার, হাজার মানুষের এই নির্বাক চাহনি যেন এক নীরব হাহাকার।
বীরভূম জেলায় ১১ হাজারের বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে স্রেফ মুছে ফেলা হয়েছে। তাঁদের সিংহভাগই বংশ পরম্পরায় বসবাস করছেন এরাজ্যেই। ভোট দিয়ে আসছেন। অথচ, তাঁদের সেই গণতান্ত্রিক অধিকার আজ সংকটে। হৃত অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় সোমবার সকাল থেকেই জেলাশাসকের দপ্তরের সামনে যে হাহাকার দেখা গেল, তা আদতে এক গভীর প্রশাসনিক সংকটের একেবারে বাস্তব ছবি। কমিশনের নিয়ম আর আধিকারিকদের ধোঁয়াশার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হাজার হাজার মানুষের ভোটাধিকার আজ খাদের কিনারায়। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট যখন উৎসবের মেজাজ নিয়ে আসে, তখন বীরভূমে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
সোমবার যখন জেলাশাসক ধবল জৈন সাংবাদিক সম্মেলন করে নির্বাচনের খুঁটিনাটি খতিয়ান দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর দপ্তরের বাইরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় প্রহর গুনছিলেন সন্তোষ বাউড়ি, তপন গঁরাই, রতন দাস, লক্ষ্মী মার্ডিরা। চেন্নাইয়ে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করা সন্তোষ বাবুইজোরের ইসলামকুড়ি গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন। বাবা-মায়ের নথির সঙ্গে মিল রেখে আবেদন করেও কেন তাঁর নাম বাদ গেল, সেই উত্তর তাঁর জানা নেই।
বোলপুরের মহুলি গ্রামের লক্ষ্মী মার্ডি বা বাহামনি মুর্মুদের গলায় কান্নার সুর। কয়েক দশক ধরে এই জেলাতেই ঘর-সংসার অথচ এক লহমায় ভোটার তালিকা থেকে মুছে গিয়েছে তাঁদের পরিচয়! তাঁদের সকরুণ প্রশ্ন, আমরা তো এখানেই আছি, তবে কেন বাদ গেলাম? নাম ডিলিট হওয়া রতনের প্রশ্ন, এবার কি তবে আমাদের বাংলাদেশে পাঠানো হবে?
কমিশন বলেছিল, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ১৫ দিন পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সেই ১৫ দিনের হিসেবে ছুটির দিনগুলি বাদ দিলে সময় কি পেরিয়ে গিয়েছে? এনিয়ে জেলাশাসক ধবল জৈন জানান, ডিলিটেড ভোটাররা নিয়ম মেনে আবেদন করতে পারেন। যতদিন পোর্টাল খোলা আছে, ততদিন অনলাইনে আবেদন করতে পারেন। তাছাড়া ফর্ম-৬ জমা দিতে পারেন। কিন্তু এখনও কতদিন ফর্ম-৬ জমা নেওয়া হবে? যাঁরা ফর্ম জমা দিচ্ছেন, তাঁদের নাম তালিকায় আদৌ নিশ্চিত হচ্ছে কি? যদি না হয় সেক্ষেত্রে কী হবে? এদিন সর্বদলীয় বৈঠকে এই প্রশ্নই করেছিল সিপিএম। যদিও উত্তর মেলেনি। আধিকারিকরা নিজেরাই এনিয়ে সংশয়ে। আর প্রশাসনের এই সংশয়ই এখন সাধারণ মানুষের চরম হয়রানি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিন সকাল ন’টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর দুপুর দু’টো থেকে ফর্ম জমা নেওয়া শুরু হলেও সেই ফর্ম আদৌ গৃহীত হবে না কি ভিড় কমানোর জন্য স্রেফ জমা রাখা হল, তার নিশ্চয়তা নেই। যারা আগেই ফর্ম-৬ পূরণ করেছিলেন, তাঁদের ১৫ মার্চের মধ্যে ডাকার কথা থাকলেও ফোন আসেনি বলেই অভিযোগ। কাজেই কমিশনের এই ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বীরভূমের নির্বাচনী আবহে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল।
ভোট ঘোষণার পরেও লম্বা লাইন নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের। সিউড়ির প্রশাসনিক ভবনে তোলা নিজস্ব চিত্র