


সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: লাল মাটির গন্ধ আর শাল-পলাশের ছায়া ঘেরা ছাতনার দুমদুমি গ্রাম। বাঁকুড়া শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার পথ এগোলেই বদলে যায় প্রকৃতির ক্যানভাস। গ্রামের গা ঘেঁষা এক চিলতে মাঠ। লাল মাটিতে ধুলো উড়িয়ে ছুটছে প্রায় ৩০ জোড়া পা।
‘বল রিসিভ কর, পাস বাড়া উয়াকে’। মহিলা কণ্ঠস্বর ভেসে এল মাঠের এক কোণ থেকে। ফিরে তাকাতেই বিস্ময়। ট্র্যাকশুটের বদলে লাল-পাড়ের আটপৌরে শাড়ি। আঁচলটা কোমরের সঙ্গে কষে বাঁধা। পায়ে হাওয়াই চটি। পঞ্চাশোর্ধ ভদ্রমহিলা তালিম দিচ্ছেন ৩০ জন তরুণীকে। ইনিই ভারতী মুদি ওরফে দুমদুমির ‘বড়োমা।’ মেয়েদের কাছে তিনি শুধু কোচ নন, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। ভারতী বলছিলেন, ‘জানেন তো, মেয়েদের জীবন মানেই হাজারো প্রতিবন্ধকতা। এটা করিস না, ওটা করিস না, বাড়ি থেকে বেরোস না— আরও কত কী! একটা মেয়েকে ভালো কিছু করতে দেওয়ার মানসিকতাই নাই আমাদের সমাজের।’ ভারতীর গলায় ‘নাই’ শব্দটার মধ্যেই যেন মিশে রয়েছে লালমাটির মেঠো সুর। একটু থেমে তাঁর সংযোজন, ‘গ্রামেগঞ্জে সমস্যা প্রচুর। আমরা সেই প্রতিবন্ধকতাই ভাঙছি রোজ।’
বর্ধমানের জামগ্রামে জন্ম ভারতীর। ছোটোবেলায় দৌড়েছেন অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাকে। কিন্তু মেয়েদের জন্য সেখানে এগনোর সুযোগ কোথায়? অগত্যা গ্রামের আর পাঁচজনের মতো বিয়ে করে ছাতনায় সংসার পাতা। স্বামী, ঘরকন্না, সন্তান— এসব নিয়েই দিন কাটছিল। বদলটা এল হঠাৎই। ২০০৯ সালে কাগজে মেয়েদের প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের খবর দেখে মেজো মেয়ে তানিয়া জেদ ধরে, ফুটবল খেলবে। প্রাথমিকভাবে তানিয়ার স্কুলের ২২ জন মেয়েকে নিয়ে শুরু হয়েছিল অন্য লড়াই। মেয়েদের ফুটবল? বাঁকা চোখ, বাঁকা কথা আর সামাজিক রক্ষণশীলতা নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই সব চ্যালেঞ্জকে ড্রিবল করে গোল করে যাচ্ছেন ভারতী। আর জীবনের মাঠে তাঁকে ডিফেন্স চেরা থ্রু পাস বাড়ান স্বামী শক্তিপদ মুদি। মেয়েদের আগ্রহ দেখে তিনিই ২২ জনের জন্য জুতো, জার্সি, বল কিনে দেন। আর বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দেন ভারতী। পেনসনের টাকা থেকে যতটা সম্ভব স্ত্রীকে সাহায্য করেন প্রাক্তন স্বাস্থ্যকর্মী শক্তিপদ। একটু হতাশার সুরেই ভারতী বলছিলেন, ‘শুরুর দিকে গ্রামের অনেকে অবাক হয়েছে। মেয়েরা মাঠে যাচ্ছে? আর এখন তো অভিভাবকরাই তাঁদের মেয়েদের ক্যাম্পে দিয়ে যায়।’ দুমদুমির বড়োমাও পরম মমতায় আগলে রেখেছেন তরুণীদের। তাঁর কথায়, ‘ম্যাম’ ডাকটা বড্ড শহুরে। ওদের বলেছিলাম অন্য কোনো নামে ডাকিস। ওরা ভালোবেসে বড়োমা বলে।’ ভারতীদেবী প্রকৃত অর্থেই বড়োমা। তাঁর অ্যাকাডেমি ‘ভারতীয় আদিবাসী সোসাইটি’ বহু প্রতিভার আঁতুড়ঘর। ক্যাম্পের ১৫ জন মেয়ে আজ সিভিক ভলেন্টিয়ারের চাকরি পেয়েছেন। শাড়ি ও হাওয়াই চটি পরা এক সাধারণ গৃহবধূর লড়াই লাল মাটির বুকে লিখে চলেছে নারীশক্তির জয়গান।