


অর্থজ্ঞান কর্মানুষ্ঠানের অঙ্গ, অর্থজ্ঞানব্যতিরেকে প্রকৃত কর্মানুষ্ঠান সম্ভব নয়—পূর্বোক্ত এই শাস্ত্রবচনের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ পূজার অনুষ্ঠেয় কয়েকটি অনুষ্ঠানের তাৎপর্য নির্ণয়ের চেষ্টাই এই আলোচনার বিষয়। পূজক এবং জিজ্ঞাসু, যাঁদের এই সম্বন্ধে কৌতূহল আছে, তাঁদের জন্য প্রচলিত কয়েকটি অনুষ্ঠানের তাৎপর্য অতি সংক্ষেপে এখানে দেওয়া হলো।‘অর্থজ্ঞান’ বলতে এখানে অনুষ্ঠান এবং মন্ত্র উভয়ের কথাই বলা হচ্ছে। অনুষ্ঠানের মর্মগত অর্থ পূজকের যেমন জানা থাকবে, পূজার কোন্ মন্ত্রের কি অর্থ, তাও তাঁর জানা একান্ত প্রয়োজন। সম্পূর্ণ ফললাভের জন্য উভয়েরই সমান প্রয়োজন। যাই হোক, তাৎপর্য বিষয়ে আলোচনায় প্রবেশ করবার আগে গোড়াতেই এই সম্পর্কে দু-একটি সাধারণ কথা বলে রাখা যুক্তিযুক্ত মনে করি। তাতে আলোচ্য বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। পূজার অঙ্গ বা অনুষ্ঠানের কোন একটা বিশেষ প্রক্রিয়াকে পৃথক করে দেখলে তার যথার্থ তাৎপর্য বোঝা যাবে না। বরং বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। সমগ্রতার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রত্যেকটি ক্রিয়ার সার্থকতা, এটি মনে রাখতে হবে। পূজার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ক্রিয়াই এক সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। পূজায় যেসব অনুষ্ঠানের নির্দেশ আছে, কেন এবং কি অভিপ্রায়ে এইগুলি নির্দিষ্ট হয়েছে, তার কারণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা অল্পবুদ্ধি মানুষের পক্ষে সব সময় সম্ভব নয়। তা বলে কিন্তু অনুষ্ঠানের সার্থকতার তাতে হানি হয় না। এসব ক্ষেত্রে শাস্ত্র-বিধানই চূড়ান্ত এবং অবশ্য-গ্রহণীয়। শাস্ত্রের ও পরিষ্কার নির্দেশ—“যে শাস্ত্রবিধি না মেনে নিজের ইচ্ছামত চলে, সে কখনও সিদ্ধিলাভ করতে পারে না। ইহলোকে সে যেমন সুখলাভ করতে পারে না, পরলোকেও তার শ্রেষ্ঠগতি হয় না।”
অনুষ্ঠানের সার্থকতা সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণ-জীবনে অনুভূত কয়েকটি উপলব্ধির কথা উল্লেখ করা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। উপলব্ধিগুলি তাঁর সাধকজীবনের বিভিন্ন সময়ে ঘটে থাকলেও আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় এবং বলবার সুবিধার জন্য এগুলি আমরা একসঙ্গেই উপস্থাপিত করলাম। “ঠাকুর বলিতেন, অঙ্গন্যাস, করন্যাস প্রভৃতি পূজাঙ্গসকল সম্পন্ন করিবার কালে ঐ সকল মন্ত্রবর্ণ নিজদেহে উজ্জ্বলবর্ণে সন্নিবেশিত রহিয়াছে বলিয়া তিনি বাস্তবিক দেখিতে পাইতেন।... পূজাপদ্ধতির বিধানানুসারে যখন ‘রং ইতি জলধারয়া বহ্নিপ্রাকারং বিচিন্ত্য’—অর্থাৎ রং এই মন্ত্রবর্ণ উচ্চারণপূর্বক পূজক আপনার চতুর্দিকে জল ছড়াইয়া ভাবিবে যেন অগ্নির প্রাচীর দ্বারা পূজাস্থান বেষ্টিত রহিয়াছে এবং তজ্জন্য কোন প্রকার বিঘ্নবাধা তথায় প্রবেশ করিতে পারিতেছে না—প্রভৃতি কথা উচ্চারণ করিতেন, তখন দেখিতে পাইতেন, তাঁহার চতুর্দিকে শত জিহ্বা বিস্তার করিয়া অনুল্লঙ্ঘনীয় অগ্নির প্রাচীর সত্য-সত্যই বিদ্যমান থাকিয়া পূজাস্থানকে সর্ববিধ বিঘ্নের হস্ত হইতে সর্বতোভাবে রক্ষা করিতেছে।”
স্বামী প্রমেয়ানন্দের ‘পূজা-বিজ্ঞান’ থেকে