


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিবাদী বাগের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাইটার্স বিল্ডিংয়ে রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা ফের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে এই বাড়ি থেকে মূল প্রশাসনিক কাজকর্ম গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে সরে গেলেও, মহাকরণের ইতিহাস ফিকে হয়নি এতটুকু। সাধারণ মানুষ জানেন, ইংরেজরা তাদের প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য তৈরি করেছিল রাইটার্স বিল্ডিং। কিন্তু তারও অনেক আগে এখান থেকেই কলকাতা, বলা ভালো বৃহত্তর কলকাতার শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল, তা অনেকেরই অজানা। সেই লুকিয়ে থাকা তথ্যকে সামনে এনে ইতিহাসকে নতুন করে উদযাপন করার জন্য নতুন সরকারের কাছে আরজি জানাল সাবর্ণ রায় চৌধুরীর পরিবার।
কী সেই ইতিহাস? সাবর্ণ পরিবারের বাইশতম প্রাণপুরুষ লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরী উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিণে ডায়মন্ডহারবার পর্যন্ত জায়গীর পেয়েছিলেন রাজা মানসিংহের থেকে। তখন দিল্লিতে মোঘল শাসন। ১৬০৮ সালে পাওয়া এই জায়গীরে খাসমহলের অন্তর্ভুক্ত ছিল গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও কলকাতা। এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের সুষ্ঠু শাসনের লক্ষ্যে লালদিঘির গা ঘেঁষে একটি দোতলা কাছারি বাড়ি তৈরি করেন লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরী। সেটাই ছিল তাঁর প্রশাসনিক ভবন। পরবর্তীকালে ঠিক ওই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে রাইটার্স বিল্ডিং। ১৬৬০ সালে ওখানেই তৈরি হয় শ্যামরাইয়ের মন্দির। সেই মন্দির প্রাঙ্গণে খেলা হত সাবর্ণদের বিখ্যাত সপ্তম দোল। সেই উৎসবের সাক্ষী থাকত লালদিঘি। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরীর কথায়, আজ থেকে চারশো বছরেরও বেশি সময় আগে যেখানে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল, তার ইতিহাস সাধারণ মানুষের জানা দরকার। আমরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আরজি জানিয়েছি, এই ইতিহাসকে মর্যাদা দিয়ে অন্তত একটি ফলক ওই এলাকায় লাগানো হোক। পাশাপাশি আমাদের দাবি, বর্তমানে সখেরবাজার নামে যে মেট্রো স্টেশনটি আছে, তার নাম বড়িশা রাখা হোক।
কেন সখের বাজারের নাম পরিবর্তন চাইছেন সাবর্ণরা? দেবর্ষিবাবু বলেন, এই এলাকার যা কিছু ইতিহাস, তার সিংহভাগই বড়িশাকেন্দ্রিক। এখানেই প্রথম ‘সপরিবার দুর্গাপুজো’ চালু হয় সাবর্ণদের হাত ধরে ১৬১০ সালে। বড়িশা সেই এলাকা, যেখানে ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তন হয়। সর্বধর্ম সমন্বয়ের জন্য একসময় বিখ্যাত ছিল এই অঞ্চল। কলকাতার প্রাচীনতম অন্নপূর্ণা মন্দিরের অবস্থান এখানেই। আছে রাধাকান্ত মন্দির, দ্বাদশ শিব মন্দির, চণ্ডীমন্দির। ১৭১৯ সালে শুরু হওয়া কলকাতার প্রাচীনতম রথযাত্রাও এই এলাকার ইতিহাসের অন্যতম অধ্যায়। দেবর্ষিবাবুর কথায়, যেখানে শোভাবাজারের ইতিহাসকে মর্যাদা দিয়ে সুতানুটি কথাটি মেট্রো স্টেশনে যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে একই যুক্তিতে সখের বাজার স্টেশনেরও নাম বদলে বড়িশা করা উচিত। এতে এলাকার ইতিহাসকেই সম্মানিত করা হবে। এছাড়াও বড়িশায় সাবর্ণদের সাজের আটচালা, মন্দির বা দোলমঞ্চের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলিকে সংস্কারের দাবি জানিয়েছি আমরা। কলকাতায় কালীঘাটের মন্দির তৈরির শুরুর দিন থেকে মিশে আছেন সাবর্ণরা। কারণ, সন্তোষ রায় চৌধুরী ও রাজীবলোচন রায় চৌধুরী এই কালীঘাট মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যাঁরা সাবর্ণ পরিবারের সদস্য। এই মন্দিরের সঙ্গে মিশে আছে যে মিথ, তা সর্বতভাবেই সাবর্ণদের নিজস্ব বিজয়গাথা। তাই সেই ইতিহাসকেও যাতে মন্দির স্মরণ করে, তার আরজি জানানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে, জানিয়েছেন দেবর্ষিবাবু।