


উত্তরকাশী: বর্ষার ঘনসবুজ হিমালয়। পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো সুন্দর রঙিন ঘরবাড়ি, হোটেল, রেস্তরাঁ। আর ঠিক মাঝখান দিয়ে আপনমনে বইছে ক্ষীরগঙ্গা। মনোরম এ দৃশ্য দেখা গিয়েছিল সোমবার সকালেও। দুপুরে আচমকা নামল মেঘভাঙা বৃষ্টি। আর তারপরই নদীতে এল হড়পা বান। উঁচু পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জল-কাদামাটির স্রোত নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে গেল একের পর এক বাড়িঘর। ফের প্রকৃতির তাণ্ডবের মুখে ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ড। মঙ্গলবার ক্ষীরগঙ্গার অববাহিকা বরাবর মেঘভাঙা বৃষ্টি ও তার জেরে হড়পা বানে ভেসে গেল বিস্তীর্ণ এলাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গঙ্গোত্রী যাওয়ার পথে মূল ‘স্টপওভার’ বা পুণ্যার্থীদের রাত্রিবাসের জায়গা ধারালি গ্রাম। উত্তরকাশীর হরসিলে সেনাশিবির থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি ওই জনপদে বহু মানুষ ভেসে গিয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে খবর। ইতিমধ্যে চারজনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ অন্তত ৫০ জন। কাদার স্তূপের নীচে চাপা পড়েছে বহু হোটেল-বাড়ি-গাড়ি। ফলে হতাহতের সংখ্যা অনেকটাই বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। বিপর্যয়ের অভিঘাতে ধারালি ও হরসিলের মাঝে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়ে গিয়েছে। মূলত ভেসে আসা বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ সেখানে আটকে। ফলে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাগুলি ফের বিপদের মুখে পড়তে পারে। এমনকী ধারালির ঘটনার ঘণ্টাতিনেক পর ১৬ কিলোমিটার দূরে সুখি টপ এলাকাতেও মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বানের খবর মিলেছে। জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে সুখি ও হরসিলে। লোয়ার হরসিলের একটি সেনাক্যাম্পেও আছড়ে পড়েছে কাদার স্রোত। নিখোঁজ ৯ জন জওয়ান।
রাজেশ পানওয়ার নামে এক গ্রামবাসী জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নীচে ১০-১২ জন চাপা পড়েছে বলে আশঙ্কা। জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে ২০-২৫টি হোটেল ও হোমস্টে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিকে ফোন করে তিনি পরিস্থিতির খোঁজখবরও নিয়েছেন। নিয়মিত যোগযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। সব সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও ত্রাণের কাজে সহযোগিতা করতে বলেছেন দলীয় কর্মীদের। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে ধারালিতে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণ ও উদ্ধারের কাজ শুরু করেছে আইটিবিপি, এসডিআরএফ, এনডিআরএফ, জেলাপ্রশাসন ও অন্যান্য দল। ভগবানের কাছে প্রত্যেকের নিরাপত্তা কামনা করি।’
ভারতীয় সেনার তরফে ব্রিগেডিয়ার মনদীপ ধিলোঁ জানিয়েছেন, এদিন দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট নাগাদ মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে পাহাড়ের উপর থেকে হড়পা বান নেমে এসে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। গঙ্গোত্রীর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিছিন্ন হয়ে পড়ে। ১০ মিনিটের মধ্যে ডাক্তার, চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সেনার ১৫০ আধিকারিকের টিম। পৌঁছে যায় আইটিবিপির দলও। শুরু হয় উদ্ধারের কাজ। চণ্ডীগড়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বায়ুসেনার হেলিকপ্টার। নিরাপত্তার স্বার্থে মানুষকে ভাগীরথী নদী থেকে দূরে থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে পুলিসের তরফে।
হড়পা বানের জেরে ধারালি ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে গিয়েছে একের পর এক ভয়াবহ ভিডিওয়। এমনই এক ভিডিওতে কাদামাটির স্তূপের ভিতর থেকে কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে এক ব্যক্তিকে। এক প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, ‘এমন বিপর্যয় আর কখনও দেখিনি। হোটেল থেকে বাজার, সব কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।’