


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ভোজ্যতেল, ডাল, চিনির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, কিংবা নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যবস্তু। যখন তখন দাম বেড়ে যাওয়াটাই বদলে গিয়েছে স্বাভাবিকতায়। গত এক বছরে শুধুমাত্র ভোজ্যতেলেরই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ কেন এই মূল্যবৃদ্ধি, তার কোনও জবাব উৎপাদক সংস্থাগুলির থেকে পাওয়া যায় না। এখানেই শেষ নয়। সংস্থাভেদে একই পণ্যের দামের ফারাকও রীতিমতো বিস্ময়কর। আম জনতা দিশাহারা হয়ে বিক্রেতাদের কাছে জবাব চাইলে, তাঁরাও এমআরপি দেখিয়ে দিচ্ছেন। ম্যাক্সিমাম রিটেল প্রাইস। এক মাস আগের এমআরপি কোনও এক জাদুবলে আচমকা বেড়ে যাচ্ছে। অথচ বর্ষা, ভূমিকম্প, পরিবহণ ধর্মঘট, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি—কোনওটাই নেই। একটি পণ্যের মূল উৎপাদন ব্যয় কত এবং তার আনুষঙ্গিক অন্য খরচ কেমন হয়, সেটা জানার কোনও উপায় নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মাসিক বাজার করতে গিয়ে নিয়ম করে এমআরপি বদলে যাওয়াটাই আবিষ্কার করে। ২০২২ সাল থেকে রেপো রেট লাগাতার বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধি কমানোর আশ্বাস দিয়ে এসেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। মূল্যবৃদ্ধি কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আসলে আগেই যে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, সেই বাণিজ্য লবিকে ঘাঁটানোর কাজটি করেনি মোদি সরকার বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির আঁচে দেশের আনাচে কানাচে ক্ষোভের বিস্ফোরণ শুরু হওয়ার পর টনক নড়েছে কেন্দ্রের। অবশেষে শুরু হয়েছে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা। ভারতের পণ্যসমূহের এমআরপি স্থির করার প্রক্রিয়ায় আমূল বদল চাইছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় ভোগ্যপণ্য মন্ত্রক, বাণিজ্য মন্ত্রক এবং অর্থমন্ত্রক এই লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন এবং বণিকসভাগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। বৈঠকে বলা হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় এবং উপকরণ ক্রয় সংক্রান্ত মোট খরচের সঙ্গে সাযুজ্যহীন এমআরপি আর চলবে না।
এতদিনে কেন্দ্রের মনে হয়েছে, নিত্যপণ্যে ‘যেমন খুশি এমআরপি’ ব্যবস্থায় রাশ টানা উচিত। কোন যুক্তিতে চাল, ডাল, তেল, চিনির প্যাকেটের দাম মাঝেমধ্যেই ৩ টাকা থেকে ১০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন সামনে রেখে এমআরপি ব্যবস্থার সংস্কারে নামছে কেন্দ্র। আর এই লক্ষ্যে লিগাল মেট্রোলজি আইন (২০০৯) সংশোধন করা হবে। কেন্দ্র এই নিয়ে প্রপোজাল রিপোর্ট তৈরি করছে। বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে, যে পণ্যের এমআরপি ২৫০০ টাকা, তা হঠাৎ কোন ম্যাজিকে সেল দেওয়ার নামে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হয়? একই স্টকের পণ্য হঠাৎ কীভাবে ৭০ শতাংশ ছাড় পেয়ে যায়? ব্র্যান্ডেড হোক বা ননব্র্যান্ডেড জামাকাপড়, বডি স্প্রে, এমনকী গেরস্থালির পণ্য—সর্বত্র এই এক ছবি। আর কোন যুক্তিতেই বা ট্যুরিস্ট স্পটে কোনও কোনও জিনিসের দাম বেড়ে থাকে? এই প্রত্যেকটি প্রশ্ন কিন্তু আম জনতারও।
১৯৯০ সালে স্ট্যান্ডার্ডস অব ওয়েটস অ্যান্ড মেজারস আইনের প্রথম এমআরপি ব্যবস্থা বলবৎ করা হয়েছিল। ২০১১ সালে বদল আনা হয়েছিল মেট্রোলজি আইনে। এবার ফের সংশোধনী আসছে। যে প্রস্তাবগুলি নিয়ে আলোচনা চলছে, তার মধ্যে অন্যতম হল—কিউআর কোড। তার মাধ্যমে ক্রেতা জানতে পারবেন, ওই পণ্য উৎপাদনে কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে এবং কীসের ভিত্তিতে বসানো হয়েছে এমআরপি। আবার অন্য প্রস্তাব হল, একটি সাজেস্টড রিটেল প্রাইস নামক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে স্থানীয় রিটেলারদের দাম ঠিক করার অধিকার দেওয়া হবে। যে পণ্য উৎপাদন হয়েছে যেখানে, সেই পণ্যের এমআরপি ওই এলাকার রিটেলাররা স্থির করতে পারবেন। কারণ, একই পণ্যের পরিবহণ ব্যয় এলাকা ভিত্তিতে বদলে যায়। নজর করার মতো বিষয় হল, এই ঘটনা বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। আম জনতার প্রশ্ন, এইসব কি কেন্দ্র জানত না? তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা মনে হয়নি কেন? ঘুম ভাঙতে এত দেরি কেন?