


জন্ম সার্ধশতবর্ষ পালিত হচ্ছে অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। কলকাতার অশ্বিনী দত্ত রোডের বাড়িতে কেটেছিল তাঁর জীবনের শেষ চার বছর। বাড়িটিতে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। শরৎ-সংগ্রহশালা ঘুরে এসে লিখলেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়।
অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম সার্ধশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে তাঁর জন্ম হয়। এই বিশিষ্ট সাহিত্যিক জীবনের শেষ চারটি বছর, অর্থাৎ ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত যে বাড়িটিতে কাটিয়ে ছিলেন, সেই বাড়িতেই গড়ে উঠেছে ‘শরৎ-সংগ্রহশালা’। যেটি কলকাতার অবশ্য দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে একটি।
হাওড়া জেলার সামতাবেড়ে থাকার সময়ই শরৎচন্দ্র ১৯৩৪ সালে কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। সেই বাড়িটির বর্তমান ঠিকানা হল— ২৪, অশ্বিনী দত্ত রোড, কলকাতা-২৯। কিছুদিন সামতাবেড়ে আবার কিছুদিন কলকাতা এভাবেই তিনি তখন থাকতেন। বতর্মানে বাড়িটির নাম ‘শরৎ স্মৃতি মন্দির’। এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে ‘শরৎ সমিতি’। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত খোলা থাকে এই সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম। প্রতিবছর শরৎচন্দ্রের জন্মদিবসে অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর এবং মৃত্যুদিবস ১৬ জানুয়ারি উপলক্ষ্যে এই বাড়িতে শরৎ সমিতি আয়োজন করে স্মরণসভার। এই সংগ্রহশালাটি দেখার জন্য কোনো প্রবেশ মূল্য লাগে না। স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা গ্রুপে আসতে চাইলে একদিন আগে জানাতে হয় শরৎ সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে।
গেট দিয়ে ঢুকলেই ডানদিকে রয়েছে কাচে ঢাকা গ্যালারি। তার মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ মনীষীর সার দেওয়া আবক্ষ মূর্তি। গ্যালারিটির সামনেই একটি ছোট্ট বাগান। সেখানে রয়েছে শরৎচন্দ্রের একটি আবক্ষ মূর্তি।
সুদৃশ্য এই দোতলা বাড়িটির একতলার বারান্দায় চেয়ারে বসে থাকতেন শরৎচন্দ্র। সেই সময় বাড়িটির সামনে ছিল একটি মাঠ। সেই মাঠে ছোটো ছোটো শিশুরা খেলা করত। উনি যেহেতু নিজে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা জানতেন, তাই খেলতে খেলতে কোনো শিশু চোট আঘাত পেলে তিনি নিজে তাদের ডেকে ওষুধ দিতেন। একতলার বাঁদিকে রয়েছে শরৎ সমিতির কার্যালয়। যেখানে আছে শরৎচন্দ্রের লেখা বিপুল বইয়ের সম্ভার। ইচ্ছে করলে এখান থেকে বই কেনা যায়। ডানদিকে আছে একটি হলঘর। শরৎচন্দ্রের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ছাড়াও যেখানে সারাবছর ধরেই বইপ্রকাশ, কবিতা, গান, নাচ, নাটকের মতো নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এই হলঘরটির দেওয়াল জুড়ে রয়েছে শরৎচন্দ্রের, রবীন্দ্রনাথের এবং আরও অনেকেরই দুষ্প্রাপ্য ছবি।
দোতলায় তিনটি ঘর নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সংগ্রহশালাটি। প্রথম ঘরটি সাজানো হয়েছে কথাশিল্পীর ব্যবহৃত নানান জিনিসপত্র দিয়ে। ঢুকেই বাঁদিকে কাঠের তাকের ওপর রাখা আছে তাঁর ব্যবহার করা ভিনটেজ হয়ে যাওয়া কালো ভারী টেলিফোন। তার ঠিক পাশের খোপে আছে শরৎচন্দ্রের সেই বিখ্যাত হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্সটি। এইসঙ্গেই আছে তাঁর অল্প বয়সের কাচ বাঁধানো ছবি। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘বন্দেমাতরম্’ গানটিতে প্রথম সুর সংযোজন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সুরের স্বরলিপিটি বাঁধানো রয়েছে এই ঘরের দেওয়ালে। আছে শরৎচন্দ্র যে সমস্ত বই পড়তেন সেইসব বই। আছে তাঁর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, তেলের কুপি। রাখা আছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ছবি। শরৎচন্দ্র রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ যেমন— ‘দেবদাস’, ‘পথের দাবী’, ‘দত্তা’ প্রভৃতির প্রথম সংস্করণগুলো সাজানো রয়েছে কয়েকটি কাচের আলমারিতে। আছে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত তাঁর রচনাসমগ্র। রয়েছে তাঁর রচনা সমন্বিত পত্রিকা ‘মাসিক বাঙলা দেশ’। এখানেই রাখা আছে তাঁর লেখা ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের একটি অপ্রকাশিত নাট্যরূপ। যে নাট্যরূপটি দিয়েছিলেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী।
শরৎচন্দ্র ছিলেন খুবই শৌখিন মানুষ। এই ঘরে রাখা তাঁর ব্যবহার করা আতরদান, জলপাত্র, পাথরের টেবিল-ল্যাম্প ইত্যাদি দেখলে সেই কথা আরও বেশি প্রমাণ হয়। একসময় এই বাড়িতে কলকাতার তৎকালীন সাহিত্যিকদের আসা-যাওয়া ছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার এসেছিলেন এই বাড়িতে।
ঘরের মাঝখানটিতে বড়ো কাচের শোকেসে সাজানো আছে আরও অনেক রকম স্মারক। শোকেসের ভেতর প্রথমেই চোখে পড়বে শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া উপহার। রয়েছে শরৎচন্দ্রের একটি দুর্মূল্য রচনা এবং বিভিন্ন জনকে লেখা চিঠি।
এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক রাস্তায় বেরনোর সময় সানগ্লাস বা রোদচশমা পরতেন! কাচের শোকেসে সেটিরও দেখা মিলবে। এছাড়াও রাখা আছে তাঁর ব্যবহার করা আরও দু’টি চশমা। যে কলম দিয়ে তাঁর অমূল্য রচনাসম্ভার সৃষ্টি হয়েছে, এখানে আছে তেমনই দু’টি ঝরনা কলম বা ফাউন্টেন পেন। আছে তাঁর লেটার হেড যুক্ত রাইটিং প্যাডের একটি শূন্য পৃষ্ঠা এবং তাঁর ডায়েরি। হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে, শরৎচন্দ্র ছিলেন একজন দক্ষ শিকারি! রীতিমতো বন্দুক দিয়ে অনেক পাখি শিকার করেছেন একসময়। পাখি শিকারের আগে দূরে উড়ন্ত পাখি দেখার জন্য তিনি যে বাইনোকুলারটি ব্যবহার করতেন, এখানে এই কাচের শোকেসের ভেতরে রাখা আছে সেটি। এছাড়াও তাঁর পাখি শিকারের সেই বন্দুকটি দেখা যাবে!
পরে অবশ্য তিনি পশুপ্রেমের কারণে শিকার করা ছেড়ে দেন। জীবজন্তুর দুঃখ দুর্দশা দেখলে বা তাদের দুঃখের কাহিনি শুনলে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়তেন! পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্র ‘কলকাতা পশুক্লেশ নিবারণী সমিতি’র হাওড়া শাখার চেয়ারম্যানও হন। তাঁর প্রিয় পোষ্য কুকুরটির নাম ছিল ভেলু। এমনকি তিনি যখন আরামকেদারায় শুয়ে বিশ্রাম করতেন, তখনও ভেলু বসে থাকত তাঁর পায়ের কাছে।
জীবিকার সন্ধানে শরৎচন্দ্র বর্মা (অধুনা মায়ানমার) চলে যান। এই শোকেসে আছে তাঁর সেই নীলরঙের পাসপোর্টটি! যার ওপর লেখা রয়েছে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট’। নীচে লেখা রয়েছে এস সি চ্যাটার্জি।
তখনকার দিনের কলকাতার ১০১-১ নম্বর ক্লাইভ স্ট্রিটে ছিল নামকরা লয়েডস ব্যাংক লিমিটেড। যেটির হেড অফিস ছিল লন্ডনে এবং যার শাখা ছড়িয়েছিল তৎকালীন বম্বে, কলকাতা (দু’টি শাখা), করাচি, লাহোর, দিল্লি, নয়াদিল্লি, রেঙ্গুন, শ্রীনগর, গুলমার্গ ইত্যাদি জায়গায়। শরৎচন্দ্রের অ্যাকাউন্ট ছিল এই ব্যাংকে। এই শোকেসে দেখতে পাওয়া গেল তাঁর নামাঙ্কিত সেই পাসবইটিও।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁকে মানপত্র ও সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। এখানে রয়েছে তার কয়েকটি নিদর্শন। যার মধ্যে রয়েছে শিলং প্রবাসী বাঙালিগণ, বৈদ্যবাটি যুবসংঘ, শিবপুর সাহিত্য সংসদ, যশোহর সাহিত্য সংঘ প্রভৃতি। তবে সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরৎচন্দ্রকে দেওয়া ‘ডি-লিট’ উপাধির শংসাপত্রটি!
এছাড়াও আছে যে পাথরের থালা-বাটি-গ্লাসে উনি খেতেন, সেগুলো। তাঁর ব্যবহৃত ধুতি-চাদর-জামা-প্যান্ট-মাফলার-সিল্কের মোজা-টুপি। এছাড়াও রয়েছে শরৎচন্দ্রের তিনটি বাঁধানো দাঁত।
দ্বিতীয় ঘরটি ছিল লেখকের শোওয়ার ঘর। এখানে দেওয়াল-আলনায় ঝুলছে তাঁর হ্যাটখানা। যে খাটে তিনি ঘুমোতেন সেই খাটটিও আছে। রয়েছে তাঁর চেয়ার-টেবিল এবং সাধের গড়গড়াটিও। এই ঘরেরই লাগোয়া আরেকটি ঘরে তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন। সেই খাবার-ঘরটিতে ঢুকলেই চমকে উঠবে, ছোট্ট বন্ধুরা! দেখবে, আরামকেদারার ওপর আধশোয়া শরৎচন্দ্রকে! যাঁর পায়ের কাছে বসে রয়েছে তাঁর আদরের ‘ভেলু’! প্রমাণ সাইজের মূর্তি দু’টি দেখলে সত্যি জীবন্ত মনে হয়।
এই বাড়ি থেকেই অসুস্থ হয়ে ১৯৩৮ সালে শরৎচন্দ্র হাসপাতালে ভরতি হন। ১২ জানুয়ারি তাঁর যকৃতের অপারেশন হয়। এর চারদিন পর অর্থাৎ ১৬ জানুয়ারি শরৎচন্দ্রের জীবনাবসান হয়। রয়ে যায় তাঁর জীবনের শেষ চারটি বছরের সাক্ষী বহন করা এই বাড়িটি! বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল লেখকের স্মৃতিধন্য বাড়িটি বাঙালির কাছে পীঠস্থান স্বরূপ। তাই সুযোগ পেলে ঢুঁ মারাই যায় এখানে।