


সমৃদ্ধ দত্ত: একটি ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ দাবানল সৃষ্টি করে কীভাবে? ভারত নামক একটি দেশ জানে। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব হার্বাট রিসলে ঘরোয়া আড্ডায় হঠাৎ বলেছিলেন, এই বাংলা নামক প্রদেশটাকে ভেঙে দিতে পারলে অনেক ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু শুধু ঘরোয়া আড্ডায় সেই মনোভাব সীমাবদ্ধ থাকেনি। ওই প্রস্তাবটিকে বেশ উপযুক্ত বলে মনে করেছিলেন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। তিনি সত্যিই বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রস্তাব যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে একটি জনতার রোষে পরিণত হবে, তা ভাবেননি ঔপনিবেশিক কর্তারা।
১৯১৯ সালে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে কিছু সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় কয়েকজন নেতার আহ্বানে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক বাগানে সমবেত হয়েছিলেন, কিছুক্ষণ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করবে ভেবে। কিন্তু রেজিনাল্ড ডায়ার নামে এক অফিসারের মাথায় ছোটো একটি সিদ্ধান্ত এসেছিল। গুলি করে সবক’টাকে মারতে হবে। সেদিন ডায়ারের ওই সিদ্ধান্ত গোটা ভারতকে বদলে দেয়। যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এতদিন ছিল ক্ষোভ-ক্রোধ, তা পর্যবসিত হয়ে গেল ঘৃণায়।
১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর। গুজরাতের কাঠিয়াওয়াড় জেলার মাচ্চু নদী সংলগ্ন জনপদ মোরবির লুখধিরসিংজী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ুয়াদের হস্টেলের মাশুল আচমকা অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হল। আগাম কিছু জানানো হয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে সুপারিন্ডেন্টের কাছে ছাত্ররা জানতে চায়, এত টাকা বাড়ানো হল কেন? সুপার বলেন, ‘উপর থেকে অর্ডার আছে। আমি জানি না।’ ক্ষুব্ধ ছাত্ররা উত্তর না পেয়ে মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এবং গবেষণাগারে ঢুকে রীতিমতো ভাঙচুর করল। কাঠিয়াওয়াড়া জেলা এক প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামীর পৈতৃক বাড়ি। সেখানে তাঁর অনেক বছর কেটেছে। তাঁর জেলায় এরকম আন্দোলনের জন্য হিংসার সূত্রপাত হওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি ছিলেন আজীবন অহিংসার পূজারি। সেই নেতার নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
সরকারের উচিত ছিল এই ক্রোধকে সামাল দিতে আলোচনা করে শান্তি ফেরানোর। সামান্য ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা। কিন্তু চিরকালই ক্ষমতা সাধারণত এই দুই গুণকে কমিয়ে দেয়। সুতরাং গুজরাত সরকারের নির্দেশে কলেজ ৪০ জন পড়ুয়াকে সাসপেন্ড করল। অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হল। স্ফুলিঙ্গটা কিন্তু রয়েই গেল।
২০ ডিসেম্বর, ১৯৭৩। এবার আমেদাবাদের এল ডি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। হস্টেলের খাবারের দাম ২০ শতাংশ বেড়ে গেল। পড়ুয়ারা প্রতিবাদ করলেন। কিচেন ইনচার্জ বললেন, ‘জিনিসপত্রের দাম প্রচুর বেড়ে গিয়েছে। তাই অত সস্তায় তিনবেলার খাবার সম্ভব নয়।’ ৩ জানুয়ারি। ওই কলেজ পড়ুয়াদের যে মোট বিল অর্থাৎ কলেজ-হস্টেল এবং খাবারের খরচ, সেটা আবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন? বলা হল, নতুন বছরে নতুন মাশুল। ৩০ টাকা বেশি।
মানে? বছরের শেষে একবার বাড়ানো হচ্ছে! বছরের শুরুতে ফের বাড়ানো হচ্ছে। আর তাছাড়া সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভরতুকি দেওয়া হবে না? এটাই তো সরকারের কাজ, যাতে গরিব ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করতে পারে! প্রিন্সিপাল বললেন, ‘আমাদের হাতে নেই। সরকার দেখছে। পড়ুয়ারা আলোচনা করতে চাইল।’ কলেজ বলল, ওসব জানি না। মোরবির মতো কিন্তু ভাঙচুর করার চেষ্টা করবে না। ফল ভালো হবে না। হুমকিতে কাজ হল। এবার শুধু বিক্ষোভ নয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল ল্যাবরেটরিতেও। তারপর শুরু হল অবস্থান-বিক্ষোভ-ধরনা। আটটি ট্রাক ভরতি করে পুলিশ বাহিনী এল একটি কলেজের ছাত্র আন্দোলন মোকাবিলায়। ৩২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হল। ৪০ জনের বেশি সাসপেন্ড। আর সাড়ে তিনশো ছাত্রকে আহত করা হল নির্বিচার লাঠিচার্জে।
সবার আগে এগিয়ে এল রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৬২টি শ্রমিক ও কর্মী সংগঠনের একটি জোট। ‘১৪ আগস্ট শ্রমজীবী সমিতি’। ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে দুদিনের ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ সমাবেশের ডাকা দিল তারা। ফল, গুজরাত বন্ধ! কিন্তু ছাত্রদের একজোট করার জন্য একটি সংগঠন দরকার তো! কারণ, অন্য কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে আসছে, আন্দোলনে অংশ নিতে তারাও উৎসুক। রাতারাতি তৈরি হল ছাত্রদের সংগঠন। নবনির্মাণ যুবক সমিতি। একদিনের আন্দোলন কার্যত পরিণত হল লাগাতার আন্দোলনে। যা ছিল হস্টেলের খাবারের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ, সেটাই পরিণত হল রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে। কারণ, খাবারের দাম কেন বেড়েছে? মূল্যবৃদ্ধির জন্য। মূল্যবৃদ্ধি কেন হয়েছে? সরকার উদাসীন তাই। সরকারের পরিচালক কে? কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেল। যার ডাক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চিমন চোর’!
অতএব আর হস্টেলের খাদ্যের দাম কমানো নয়। এবার সরাসরি দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই, সরকারের পতন চাই। ছাত্রদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল শ্রমিকরা। সৌরাষ্ট্র থেকে কৃষকরা। গৃহবধূরা। সরকারি কর্মীরা। এবং দিল্লিতে বসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বারবার চিমনভাইকে বললেন, এসব কী হচ্ছে! ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? কিন্তু ততদিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে আন্দোলন। তিন মাসের মধ্যে চিমনভাই প্যাটেল পদত্যাগ করলেন। গুজরাত সরকারেরও পতন হল। এই প্রথম ছাত্রদের আন্দোলন পরিণত হয়েছিল গণআন্দোলনে। যদিও ১৯৬৭ সালে তামিলনাড়ু দেখেছিল এই প্রবণতা। তবে সেটি ছিল ডিএমকের ভাষা আন্দোলন—হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্র। আর রাজ্যে সরকারের পতনও ঘটেছিল। কিন্তু নিছক ছাত্র ও যুব আন্দোলন গুজরাতেই প্রথম হল।
ঠিক যেদিন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে গুজরাতে, তার দু’দিন পর এক প্রবীণ সমাজসেবী আমেদাবাদে এসেছিলেন। ছাত্র-যুবদের সঙ্গে দেখা করে বললেন, ‘আমি অভিভূত। এরকমভাবে যে গণ আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথম দেখলাম।’ ১৯৭৪ সালের ‘এভরিম্যানস উইকলি’ নামক একটি পত্রিকায় ওই প্রবীণ মানুষটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, ‘অনেক বছর ধরে আমি একটি রাস্তার সন্ধান করছিলাম। আমার লক্ষ্য ছিল স্থির। কিন্তু পথ কী হবে? সেটাই খুঁজে পাইনি। আমি ২ বছর ধরে সময় নষ্ট করছিলাম সমমনস্ক মানুষ, রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কিছু একটা প্রতিবাদ গড়ে তোলার। কারণ, রাষ্ট্রব্যবস্থার বদল দরকার ছিল। অন্তহীন দুর্নীতি, দমনপীড়ন, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি আম জনতার নাভিশ্বাস তুলছে। আমি রাস্তা পাইনি কিছু। তারপর আমি দেখলাম গুজরাতের ছাত্রদের। তারা পেরেছিল। আমি বুঝলাম, ওটাই ছিল রাস্তা। সেই পথেই পা বাড়াই। ’ এই ৬৮ বছরের প্রবীণ লেখক ও সমাজসেবীর নাম ছিল জয়প্রকাশ নারায়ণ।
ঠিক গুজরাতের ঘটনার অনুরূপ বিক্ষোভের আঁচ টের পাওয়া গেল বিহারে। ১৯৭৩ সালেই। গুজরাত দেখে তারা অনুপ্রাণিত। ১৯৭২ সালে এই রাজ্যে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান থেকে বিজলি-পানি-সড়ক দিতে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে ক্ষোভে মানুষ যেন ফুঁসছে। মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রফেশনাল ট্যাক্সের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও কর্মীদের একটি সংগঠন তৈরি হল। তারাই প্রথম একটি স্লোগানের সূত্রপাত করল, ‘পুরা রেশন পুরা কাম/নেহি তো হোগা চাক্কা জ্যাম।’
এই সংগঠন ছিল মূলত বামপন্থী। তৎক্ষণাৎ দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ ভাবল, আমরাই বা কম যাব কেন? তারা তৈরি করল ছাত্র সংঘর্ষ সমিতি। ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে এই সংগঠন তীব্র আন্দোলন শুরু করল। এফসিআইয়ের গুদামে পর্যন্ত আগুন ধরানো হল। পুলিশ যথেচ্ছ লাঠিচালনা করল। মাথা ফাটল বহু ছাত্রের। স্বাভাবিকভাবেই অন্য ছাত্র সংগঠনগুলিও এগিয়ে এল এবার। আর কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন নয়। এবার একজোট গোটা ছাত্রসমাজ। লাগাতার আন্দোলন বিক্ষোভ তো চলছেই। কিন্তু একটা অভিমুখ থাকা দরকার তো! সেটা কী? কীভাবে অগ্রসর হওয়া যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই অল্পবয়সি ছাত্রছাত্রীদের কাছে।
পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এক তরুণ ছাত্রনেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের কদমকুয়ার বাসভবনে গিয়ে বলল, ‘বাবুজি, আমরা তো ছোটো। আপনি আমাদের দিশা দিন।’ ভোজপুরী টানে কথা বলা ছেলেটি বলল, ‘আমরা একটা মিটিং করছি। হুইলার সেনেট হলে। বাবুজি আপনি আসুন একবার। আপনাকে দেখলে গোটা ছাত্রসমাজ মনে বল পাবে। আমরা এই আন্দোলনকে যতদূর যেতে হয় নিয়ে যাব।’ ছেলেটিকে আশ্বস্ত করে জয়প্রকাশ নারায়ণ বললেন, ‘আমি যাব।’ সেনেট হলে যতক্ষণ ধরে জয়প্রকাশ ভিড়ে ঠাসা সমাবেশে ভাষণ দিলেন, সেই ছাত্রটি পোডিয়ামে তাঁর পায়ের কাছে বসে ছিল। কী ছিল তার নাম? লালুপ্রসাদ যাদব!
জয়প্রকাশ নারায়ণ এই অভূতপূর্ব ছাত্রদের সাড়া লক্ষ্য করে স্থির করলেন, হ্যাঁ, গুজরাত যে পথ দেখিয়েছে এটাই সেই পথ। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে পাটনার এক মহাসমাবেশ থেকে ডাক দিলেন নতুন এক আন্দোলনের। সম্পূর্ণ ক্রান্তি। টোটাল রেভল্যুশন। আর শুধু বিহারে আটকে রইল না। সেই আন্দোলনের নামই হয়ে গেল ‘ইন্দিরা হটাও’। সেই আন্দোলনের ফলাফল কী হয়েছিল সর্বজনবিদিত। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তাঁর ও কংগ্রেস সরকারের।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ছাত্র যুবদের কোনও বিক্ষোভ যদি ক্রমেই গণ আন্দোলনে পর্যবসিত হয়, তাহলে সেই আন্দোলনের জেরে সর্বদাই সরকারের পতন ঘটেছে। গুজরাত এবং বিহার সেই পথ দেখিয়েছে। কিন্তু ওই দুই আন্দোলনের জেরে সরকার পতন নিছক কাকতালীয় নয়, তার প্রমাণ নিয়ে আবার হাজির হয়েছিল ১৯৯০ সাল। ১০ বছর ধরে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধী উভয় সরকারই কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অনগ্রসরদের জন্য যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে, তার বাইরেও ওবিসিদের জন্য নতুন করে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের সুপারিশ করেছিল ওই কমিশন। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিন্ধ্যেশ্বর মণ্ডলের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠন করেছিলেন জনতা পার্টির মুখ্যমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। কিন্তু এই কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ার আগেই তাঁর সরকারের পতন হয়। ১৯৮০ সালে এই রিপোর্ট যখন জমা পড়ে, তখন আবার ক্ষমতাসীন হয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর সরকার এই রিপোর্টকে একপ্রকার ঠান্ডাঘরেই পাঠিয়ে দেয়।
বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং ক্ষমতায় এসেই স্থির করলেন যে, সবার আগে তাঁর মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি হল, মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট বলবৎ করা। যেমন কথা তেমন কাজ। ১৯৯০ সালের ১৩ আগস্ট তাঁর সরকার ঘোষণা করল, উচ্চশিক্ষায় এবং সরকারি চাকরিতে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ পাবে ওবিসি।
ব্যস! আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ল। গোটা ভারতে যেন ভূমিকম্প হল। জেনারেল ক্যাটিগরির ছাত্র-যুবদের মধ্যে একটি চরম আতঙ্ক গ্রাস করল যে, তাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে এবার। কারণ, ৪৯ শতাংশ হয়ে যাবে সংরক্ষণ। মেধার ভিত্তিতে আর শিক্ষা ও চাকরি কিছুই হবে না। আন্দোলন শুরু হল প্রধানত উত্তর ভারতে। আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ প্রথম জ্বলল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজীব গোস্বামী নামক এক ছাত্র সংরক্ষণের প্রতিবাদে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল প্রকাশ্যে। কোনোক্রমে সে বেঁচে গেলেও তার শরীর চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হল। কিন্তু ওই আগুন তার গায়ে লাগেনি শুধু, অসংখ্য সাধারণ ছাত্রছাত্রীর অন্তরে গিয়ে স্পর্শ করল।
আর তারপর শুরু হল দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা করার এক আশ্চর্য ও ভয়ংকর প্রবণতা। রাস্তায় আন্দোলন, পুলিশের দমন-পীড়ন, কাঁদানে গ্যাস এবং তার সঙ্গে নিজের গায়ে আগুন দেওয়া। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সংরক্ষণ বিরোধী মনোভাব ঠিক কতটা স্পর্শ করেছিল, তার প্রমাণ—২০০ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে গোটা আন্দালনপর্বে। ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল! স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এরকম মর্মান্তিক গণআন্দোলন আর হয়নি।
মাত্র তিন মাসের মধ্যে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের পতন হয়েছিল। আপাত কারণ ছিল, বিজেপির সমর্থন প্রত্যাহার। কিন্তু মূল কারণ, উচ্চবর্ণের ছাত্র-যুব সমাজের এই আন্দোলনের তির, যার বিরুদ্ধে যেতে রাজি হয়নি আতঙ্কিত বিজেপি। তাদের তখন উত্থানের সময়। এই সময় উচ্চবর্ণের যুবসমাজ সরে গেলে চরম বিপদ। ১৯৯০ সালের আন্দোলনের জেরে বিরোধীদের পতন হওয়ায়, ১৯৯১ সালে আবার ক্ষমতাসীন হয়ে যায় কংগ্রেস।
আবার ২০১১ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন যতটা না প্রভাব ফেলল, তাকে ছাপিয়ে গেল অন্য একটি ইস্যু—নির্ভয়া! দিল্লির রাস্তায় বাসের মধ্যে এক তরুণীকে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ ও হত্যা। সেই নির্ভয়া নিজের প্রাণ দিয়ে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে গেল। যুবসমাজের বিদ্রোহের আঁচে ২০১৪ সালে দিল্লির এবং কেন্দ্রীয় সরকার একসঙ্গে অগ্নিদগ্ধ হয়। পতন ঘটে কংগ্রেস পরিচালিত দুই সরকারেরই।
কী কী মিল আছে? ১৯৭৪ সালে ভরকেন্দ্র হয়েছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ। ২০১১ সালে আন্না হাজারে। ২০২৬ সালের নিট পরীক্ষার প্রতিবাদে সোনাম ওয়াংচুক। অর্থাৎ তিনজন আপাত অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে সামনে রেখে প্রতিটি আন্দোলনের সূত্রপাত। ১৯৭৪ সালে তৈরি হয়েছিল ছাত্র সংঘর্ষ সমিতি। ২০২৬ সালে ককরোচ জনতা পার্টি। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসে ভারতীয় লোকদল, সোশ্যালিস্ট পার্টি, কংগ্রেস (সংগঠন),জন সংঘ একজোট হয়ে তৈরি করেছিল জনতা পার্টি। ছাত্রদের পাশাপাশি বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ। ২০২৬ সালে যেমন গোটা ইন্ডিয়া জোট।
ছাত্র আন্দোলন যদি গণআন্দোলনের রূপ নিয়ে নেয়, তাহলে সেটি বারবার পর্যবসিত হয়েছে রাজনীতির চমকপ্রদ এক বাঁকে। পরবর্তী ভোটে ফলাফল উলটো হয়ে যায়। শাসকের পক্ষে যা বিপজ্জনক। প্রত্যেকটি আন্দোলনের সময়ই সরকারপক্ষের সবথেকে বড়ো যে ভুল হয়েছে, সেটি হল পুলিশ দিয়ে দমনপীড়ন। অত্যাচার, আক্রমণ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি শাসকের পক্ষ থেকে প্রতিভাত হলে তার বিরূপ প্রভাব জনমানসে অনেক বেশি পড়ে। দিল্লির ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন যে গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে এটা বুঝতে দেরি করল সরকার। সরকারের চরম ক্ষতি করেছে দিল্লি পুলিশ এবং সরকারের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। প্রথমত দিল্লি পুলিশের নৃশংস অত্যাচার ও দমননীতির দরকারই ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে সেই আক্রমণ। আর দ্বিতীয়ত, এই ইস্যুতে ভারত সরকারের সিদ্ধান্তগ্রহণে কারা প্রধান ভূমিকায় ছিল? কেন তারা একের পর ভুল পদক্ষেপ করল? অনেক আগেই আলোচনার টেবিলে বসা যেত। শিক্ষামন্ত্রী আগেই ইস্তফা দিতে পারতেন। এর জন্য আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা করা হল কেন?
৭০০ বছর ধরে মোগলরা শাসন চালিয়েও গোটা ভারতকে মুসলিম রাষ্ট্র করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০০ বছর ধরে ব্রিটিশ সরকার ভারতকে দখল করে রেখেও খ্রিস্টধর্মের রাষ্ট্রে পর্যবসিত করতে পারেনি। ৫ হাজার বছর ধরে যে দেশের জিনের মধ্যে গণতন্ত্রের ফল্গুধারা বয়ে চলেছে, সেই দেশ কোনোদিন স্বৈরতান্ত্রিক আচরণকে স্থায়ীভাবে মেনে নেয়নি। আশ্চর্য ব্যাপার হল, একথা সব যুগে, সব দলের শাসকের যেন মনেই থাকে না। সকলেই ভেবেছে ‘আমি অপরাজেয়’!