


অনির্বাণ রক্ষিত: ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় ভূত মানে কী? তোমরা অনেকে উত্তর দেবে ভূত হল আত্মা। মারা যাওয়ার পরও যাঁদের আত্মা থেকে যায় পৃথিবীতে! আবার কেউ কেউ বলবে, ভূতের বাস গাছের মগডালে, আবার কারও ধারণা, তারা লুকিয়ে থাকে পুরানো, নির্জন সব বাড়িঘরে। কিন্তু বিজ্ঞান কী জানো? বিজ্ঞান বলে, ভূতের জন্ম আমাদের ভয় থেকে। যখন আমরা ছোটো ছিলাম, তখন দাদু-ঠাকুরমা কিংবা মা আমাদের শোনাতেন ভূতের গল্প। গা ছমছমে সেসব গল্প শুনে ভয়ও পেতাম, আবার মজাও লাগত! এভাবেই ধীরে ধীরে আমাদের মনের ভেতরে গড়ে ওঠে ভূতের জন্য আলাদা একটা রাজ্য।
এমনকি বিশ্ব সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেও ভূতের গল্প অনেক আগেই ঢুকে পড়েছে। সেই প্রায় দেড়শো বছর আগে থেকেই ভূতের গল্প লিখছেন লেখকেরা। এই যেমন ধর—লালবিহারী দে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের মতো বিখ্যাত সব লেখক। তাঁরা লিখেছিলেন এমন সব গল্প, যেগুলো পড়ে আমরা এখনও মজা আর ভয় পাই। তোমরা নিশ্চয়ই ঠাকুমার ঝুলির নাম শুনেছ। সেখানেই তো আছে ভূত, পেতনি, ডাইনি আর কত রকমের ভূতের হট্টগোল! কিছু গল্প ভয় পাওয়ার জন্য, কিছু গল্প হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে পাঁচটি অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন, সেগুলিকে মনে করা হয় ভূত ছাড়া ভূতের গল্প! ‘কঙ্কাল’, ‘নিশীথে’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ও ‘মণিহারা’ এই ধারার গল্প। এ তো গেল ভূতের কথা। এবার তোমাদের জানাব ভূত নিয়ে বিভিন্ন দেশের নানান উৎসবের কথা। যা জানলে তোমাদের মনে ভূত নিয়ে আগ্রহ আরও বাড়বে।
ভূত চতুর্দশী
মহালয়ায় প্রয়াত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তিল ও জল অর্পণ করা হয়। তেমনই আমাদের দেশে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে বা এককথায় বলতে গেলে কালীপুজোর ঠিক আগের দিন পিতৃপুরুষের উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোর বিধান রয়েছে শাস্ত্রে। বাঙালি হিন্দুদের কাছে এই তিথি ‘ভূত চতুর্দশী’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের একাংশে এই তিথিকেই ‘নরক চতুর্দশী’ বলে। ‘নরক’ কেন নাম? পুরাণ মতে, এইদিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী সত্যভামা অত্যাচারী নরকাসুরকে বধ করেছিলেন। সেই নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘নরক চতুর্দশী’ নামকরণ করা হয়েছিল। এবার তোমাদের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে ভূত চতুর্দশীর দিন কেন জ্বালানো হয় চোদ্দো প্রদীপ? প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণ ও কল্পকথা অনুসারে এই রীতির নেপথ্যে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন, একটি মত হল, ১৪ জন প্রেত অনুচরকে সঙ্গী করে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে অশুভ শক্তির বিনাশ করেন দেবী চামুণ্ডা। অন্য মত অনুসারে, এদিন স্বর্গ ও নরকের দ্বার কিছুক্ষণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেই দরজা দিয়ে পরলোকগত আত্মারা মর্তে ফিরে আসেন। পিতৃকুল ও মাতৃকুলের চোদ্দো পুরুষের অশরীরী আত্মা নেমে আসেন গৃহস্থের বাড়িতে।
এই তিথিতেই নাকি রাজা বলি অসংখ্য অনুচরসহ ভূত, প্রেত নিয়ে মর্তে নেমে আসেন পুজো নিতে। বলি রাজা, পূর্বপুরুষের প্রেতাত্মা ছাড়াও নানান বিদেহী আত্মারা এদিন মর্তলোকে নেমে আসে। ভূত, পিশাচ, প্রেত থেকে বাঁচতে, অতৃপ্ত আত্মাদের অভিশাপ থেকে বাঁচতে ও নেগেটিভ এনার্জি বা অশুভ শক্তিকে বাড়ি থেকে তাড়াতেই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।
হ্যালোইন
মূলত পশ্চিমি দেশগুলিতে হ্যালোইন উৎসবের জন্ম হলেও এখন তা পালিত হয় পৃথিবী জুড়ে। সবাই সেজে ওঠে নানারকম পোশাকে। সাজিয়ে তোলে নিজেদের ঘর বাড়ি। সাজে থাকে ভৌতিক ছোঁয়া। মূলত পশ্চিমা বিশ্বেই প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালন করা হয় এই উৎসব। হ্যালোইন অনেক জায়গায় ‘অল সেন্টস ইভ’ নামেও পরিচিত। এই প্রথার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে। হ্যালোইন শব্দের অর্থ ‘পবিত্র সন্ধ্যা’। এই দিন সাধু বা মহাপুরুষদের স্মরণ করা হয়। যে সব আত্মার মুক্তি ঘটেনি, তাদের জন্যও প্রার্থনা করা হয়। হ্যালোইনে একটি সবজির গুরুত্ব অনেকখানি। সেটি হল কুমড়ো। অনেকেই কুমড়ো দিয়ে সাজিয়ে তোলেন নিজেদের বাড়ি। কিন্তু কেন হঠাৎ কুমড়োই হয়ে উঠল উদ্যাপনের উপকরণ? শোনা যায়, এক সময়ে উত্তর আমেরিকার পরিযায়ীরা শালগমের বদলে কুমড়োর ব্যবহার শুরু করেন। আমেরিকায় তখন ফসল কাটার সময়। তাই খেত থেকে অপদেবতাদের দূরে রাখতে কুমড়োর ভিতরে আলো জ্বালিয়ে রাখার প্রথা চালু হয়। এই বিশেষ দিনটিতে ভূতেদের দূরে রাখতে মানুষই ভূতের মতো পোশাকে সেজে ওঠে। এই উৎসব এখন আনন্দের উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দিন বাচ্চা থেকে বয়স্ক, সকলেই তাই ভূত সেজে মজায় মাতেন।
দিয়া দে লস মুয়েরতস
স্প্যানিশ ভাষায় এর অর্থ হল ‘মৃত আত্মাদের দিন’। আত্মাদের শান্তি প্রার্থনায় মেক্সিকোতে প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর আয়োজন করা হয় এই উৎসব। ১ নভেম্বর ‘অল সেইন্টস ডে’ আর ২ নভেম্বর ‘অল সোলস ডে’ উদ্যাপনের মাধ্যমে শেষ হয় এটি। রোমান ক্যাথলিক, প্রাচীন মায়ান ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ বিশ্বাস করত, মৃত মানুষের ওপারের জীবন শান্তিময় করতে এপারের মানুষের প্রার্থনার প্রয়োজন। অ্যাজটেক সভ্যতায় ‘মিকটেকাসিওয়াল্ট’ হলেন মৃতদের রানি। তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য মূলত এই উৎসবের প্রচলন। চকলেটের খুলি আর গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে সম্মান জানানো হয় তাকে। বিভিন্ন সমাধিসৌধে পালিত হয় উৎসবটি। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে উৎসবটি।
হাংরি ঘোস্ট ফেস্টিভ্যাল
চীনের সংস্কৃতিতে এই উৎসব পরিচিত ‘ইউ লান’ বা ‘ঝং ইউন জি’ নামে। চৈনিক বর্ষপঞ্জিতে সপ্তম মাসটি ঘোস্ট মান্থ। আর এই ভূতুড়ে মাসের ১৫তম দিনটি ঘোস্ট ডে বা ভূতের দিন হিসেবে প্রচলিত। তাদের বিশ্বাস, এই দিনে নরকের দরজা খুলে যায়। অপঘাতে মৃত মানুষের আত্মারা এ সময় ফিরে আসতে পারে। এই ভাবনা থেকেই সেই অতৃপ্ত আত্মাদের উদ্দেশে খাবার সাজিয়ে রাখে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা। তাদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনাও করা হয়। মজার ব্যাপার হল উৎসবে নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রথম ৫০টি আসন রাখা হয় এসব আত্মার জন্য! তা ছাড়া ফানুস উড়িয়ে, পদ্ম ফুলের আকৃতির বাতি জলে ভাসিয়ে উদ্যাপিত হয় উৎসবটি। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বেশ জনপ্রিয় উৎসব এটি।
ওবন
এটি জাপানের ঐতিহ্যবাহী ভূত উৎসব। যা প্রতিবছর উদ্যাপিত হয়। লুনার বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাসটিতে। লোকবিশ্বাস, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মৃত আত্মারা এপারের দুনিয়ায় আসে। তাদের স্বাগত জানানো হয় জাপানি ঐতিহ্যবাহী নাচ ‘বন অদোরি’ দিয়ে। ওপারের জীবনে আত্মারা যেন আবার ঠিকমতো ফিরে যেতে পারে, সেজন্য নদী কিংবা লেকের জলেতে পদ্ম ফুলের আকৃতির বাতি ভাসিয়ে দেওয়া হয়।