


বাঙালি নারী যে ব্রতটির জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকে, তা হল কোজাগরী লক্ষ্মীর ব্রত। আশ্বিন মাসের কোজাগরী পূর্ণিমায় সারাদিন উপবাসী থেকে বাড়িজুড়ে লতা-পাতা-ফুল সজ্জিত আলপনায় আবাহন করা হয় ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবীকে। যখন ঘরে শস্য আসে, তখন এই ব্রত পালনের সময়। সৌভাগ্য কামনায় তা করে থাকে বাঙালি নারী।
ব্রত কথাটি নিবেদন করি।
দোল পূর্ণিমার আকাশ। সময় রাত্রি। বেশ মলয় বাতাস বইছে। লক্ষ্মী-নারায়ণ বসে নিজেরা কথা বলছেন। নারদ মুনি এলেন। এসে লক্ষ্মীনারায়ণকে নমস্কার করে জানালেন, মর্ত্যবাসী অন্নাভাবে আছে। অন্নের অভাবে মর্ত্যবাসীর শরীর ক্রমশ জীর্ণ শীর্ণ হয়ে উঠছে। তাদের কথা শুনে লক্ষ্মী দেবী চিন্তা করলেন। শ্রীনারায়ণকে জিজ্ঞাসা করলেন কি করে দুঃখকে হরণ করা যায়।
‘হরি কহে, শুন সতী বচন আমার।
মর্ত্যধামে লক্ষ্মী ব্রত করহ প্রচার।।
প্রতি বৃহস্পতিবারে মিলি যত এয়োগণে।
সন্ধ্যাকালে পূজি কথা শুনিবে শ্রবণে।।
বাড়িবে ঐশ্বর্য তাহে তোমার কৃপায়।
দুঃখ-কষ্ট দূরে যাবে তোমার দয়ায়।।’
শ্রীহরির কথা শুনে দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। এগিয়ে চললেন মর্ত্যের দিকে। এসে পৌঁছলেন অবন্তী নগরে। যা দেখলেন, যা শুনলেন তাতে তিনি অবাক হলেন। নগরের লক্ষপতি ধনেশ্বর রায়, কুবেরের মতো তাঁর অবাধ ঐশ্বর্য। তার সোনার সংসারে দ্বেষ, হিংসার কোনো স্থান নেই। কিন্তু সেই ভরা সংসার একদিন হঠাৎ ছারখার হয়ে গেল। সাত পুত্র রেখে ধনেশ্বর দেহ রাখলেন। পিতার মৃত্যুর পর সাত ভাই তাদের স্ত্রীর কুহক জালে নিজেরা আলাদা হয়ে গেল। লক্ষ্মী দেবী সেই পরিবার থেকে অন্তর্হিত হলেন। ধনেশ্বরের স্ত্রী একা হয়ে গিয়ে একদিন গহন অরণ্যে আত্মহত্যা করতে গেলেন। সেখানে দেখা হয়ে গেল ছদ্মবেশী নারায়ণী লক্ষ্মীর সঙ্গে। দেবী তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কেন এই গহন কান্তারে এসেছেন। অত্যন্ত হতাশায় বৃদ্ধা জানায়,
‘সহিতে না পারি আর সংসার যাতনা।
ত্যজিব জীবন আমি করেছি বাসনা।।’
দেবী লক্ষ্মী জানান আত্মহত্যা মহাপাপ। আত্মহত্যা করলে নরকে গমন হয়। এই উপদেশটুকু দিয়ে দেবী বৃদ্ধাকে জানান, তিনি নিজের ঘরে ফিরে যান এবং সেখানে গিয়ে যেন লক্ষ্মীর ব্রত করেন। লক্ষ্মী ব্রত করলেই সমস্ত দুঃখ দূরে সরে যাবে। মনেতে লক্ষ্মীর মূর্তি চিন্তা করে এক মনে ব্রত কথা শুনলে বা পাঠ করলে গৃহে লক্ষ্মী নিশ্চিত ভাবেই থাকেন। দেবী লক্ষ্মী এবার নিজের মূর্তি ধারণ করে বৃদ্ধাকে দর্শন দিলেন। বৃদ্ধা প্রণাম করেন। যা ঘটনা ঘটেছিল সবকিছু বৃদ্ধা বাড়িতে গিয়ে তাঁর বৌমাদের বললেন এবং সবাই মিলে ব্রত শুরু করলেন। আবার সেই পরিবারে দেবী লক্ষ্মীর আগমন ঘটলো। সংসারে সুখ শান্তি বিরাজ করল।
দৈবযোগে একদিন ব্রত চলাকালীন বৃদ্ধার বাড়িতে এক নারী উপস্থিত হলেন। তাঁর স্বামী অত্যন্ত অসুস্থ, চিররুগ্ন। অর্থ রোজগারের কোন ক্ষমতা নেই। কোনও রকমে ভিক্ষা করে দুজনে খায়। লক্ষ্মীব্রতের কথা শুনে ওই নারী বাড়িতে গিয়ে লক্ষ্মীর ব্রত করলেন পরম ভক্তিতে। লক্ষ্মীর কৃপায় স্বামী সুস্থ হল। সংসার তাঁর সুখের হয়ে উঠলো। সন্তান হল। লক্ষ্মীর ব্রত প্রচার পেতে শুরু করল।
অবন্তীনগরে গৃহস্থ ভবনে এয়োরা ব্রত করছে, এমন সময় একজন বণিক তনয় উপস্থিত হল। সেখানে দাঁড়িয়ে সে রীতিমত ব্রতকারীদের হেলাফেলা করলো। বণিক বলে, ‘যে জন অভাবে থাকে সে পূজে উহারে।’ বণিকের কি অহংকার কি তেজ! মা লক্ষ্মী কখনোই অহংকার বাক্য সহ্য করতে পারেন না। নাবিকের এই আত্ম-অহং- এর কারণে লক্ষ্মী ওই বণিককে ছেড়ে গেল। বণিক নানা রত্নপূর্ণ তরী নিয়ে বাণিজ্যে গেল। দৈবযোগে লক্ষ্মীর কোপে লোকজন, সপ্ততরী জলের মধ্যে ডুবে গেল। বাড়িতে যেটুকু ধনৈশ্বর্য ছিল সব বজ্রাঘাতে পুড়ে গেল। সোনার সংসার বিপন্ন হয়ে উঠল। ধনী সদাগর থেকে ভিক্ষাজীবি হতে সময় লাগলো না। কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে যখন অহংকারী নাবিক বুঝতে পারল তখন লক্ষ্মীস্তব উচ্চারণ করতে লাগলো। আবার নাবিক তার পূর্বের মতো সংসার ফিরে পেল। ব্রতকথার লেখক লিখছেন, ‘এই ব্রত যেই নারী করে এক মনে। লক্ষ্মীর কৃপায় সেই বাড়ে ধনে-জনে।।’
ব্রতকথা যারা ঘরে রাখে, তাদের লক্ষ্মীর কৃপায় সর্বদা মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। লক্ষ্মীর ব্রতের কথা হল বড় মধুময়। এবার লক্ষ্মীনারায়ণ নাম উচ্চারণের মাধ্যমে ব্রতকথার সমাপ্তি ঘোষণা হয়।
নারকেলের জল, চিঁড়ে, খই, মুড়কি, নারকেল, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, চিনির মিছরি, তিলকুট, চাল, মোয়া, বাতাসা, জোড়া পান, সুপারি, তালের ফোঁপল, হলুদ, হরিতকি, কড়ি ইত্যাদি এই পুজোয় অবশ্য প্রয়োজন। কড়ি হলো মুদ্রার প্রতীক। সমুদ্রজাত কড়ি সাজিয়ে লক্ষ্মী পুজো করা হয়।
ধনী অহংকারী এক বোন এবং গরিব ধর্মপরায়ণ এক বোনের গল্প ব্রতকথায় পাওয়া যায়। যেখানে দরিদ্র বোন লক্ষ্মীর কৃপায় সর্বসম্পদের অধিকারী হন। আর ধনী বোন তার অহংকারে লক্ষ্মীকে অবজ্ঞা করায় দেবীর কোপে সর্বস্ব হারায়। পরে লক্ষ্মীর পূজা করে সে পুরনো সম্পদ ফিরে পায়। এখানেই লক্ষ্মীর জয়গাথা।