


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ভারতের দুটো মানচিত্র আছে। একটা ভৌগোলিক। ছোটোবেলা থেকে স্কুলে তার সঙ্গে আমাদের পরিচয়। বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা চিনতে শিখি ভারতের দ্বিতীয় মানচিত্রকে। সেটি রাজনৈতিক। এই রাজনৈতিক মানচিত্রের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই ছিল এক ‘ব্যতিক্রমী’ রাজ্য। উত্তর ভারতের গো-বলয় বা পশ্চিম ভারত যখন রাম মন্দির বা হিন্দুত্বের জোয়ারে ভেসে গিয়েছে, বাংলা তখন নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ‘ভিন্নধর্মী’ রাজনৈতিক দর্শনের আড়ালে নিজেকে সুরক্ষিত রেখেছিল।
চেনা ছবিটা বদলে গেল গত ৪ মে। এই বিধানসভা ভোটের ফল সেই দীর্ঘকাল ধরে সযত্নে লালিত ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। সৌজন্যে, ভারতীয় জনতা পার্টি। বিজেপির এই ভূমিধস জয়কে শুধুমাত্র আরও একটি ক্ষমতার পরিবর্তন হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এবারের বঙ্গ ভোটে বিজেপির ২০৭ আসন প্রাপ্তি আসলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর সেই কারণেই ১২ বছরের মোদি শাসনের ইতিহাসে এই জয়কে অন্যতম কঠিন এবং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করছেন রাজনীতির কারবারিরা। কেন? তার বড়ো কারণ, জন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমি হওয়ার পরেও বঙ্গের দুর্ভেদ্য দুর্গের মাটিতে পদ্মফুল ফোটানোর জন্য যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও পরিশ্রম করতে হয়েছে, তা জানেন শুধু বিজেপির নেতা-কর্মীরা। জানেন গেরুয়া শিবিরের দিল্লির শীর্ষ নেতারাও। আসলে এর নেপথ্যে রয়েছে বাংলায় বামপন্থীদের সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনকাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের হাত ধরে বাম শাসনের অবসান হয়। পালাবদলের পর ২০১১ সালে জোড়াফুল ফোটে এরাজ্যে। তখনও বিজেপিকে এখানে দূরবিন দিয়ে খুঁজতে হত। তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের দাপুটে ইনিংসের মধ্যেই মাটি কামড়ে পড়ে থেকে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে বিজেপি। আর ২০২৬ সালের মে মাসে এসে বাংলা এখন পরিবর্তনের এক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। আসলে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে বিজেপি অনেক আগে থেকেই একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল। কিন্তু বাংলা ছিল তাদের কাছে একটা ‘অধরা স্বপ্ন’। যুক্তি, তর্ক এবং বুদ্ধিজীবী সংস্কৃতি বঙ্গ রাজনীতির মূল ভিত্তি হওয়ার কারণে বিজেপির জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদী আখ্যান সহজে এই মাটিতে জায়গা করে নিতে পারছিল না।
দীর্ঘ ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সেই ‘অধরা স্বপ্ন’কে ছুঁয়ে ফেলেছেন বঙ্গ বিজেপির নেতা-কর্মীরা। সেই সঙ্গে বাংলায় তৃণমূলের পতন এবং তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড় রাজনীতির একচেটিয়া আধিপত্যে ফাটলের মতো দু’টি ঘটনাই প্রমাণ করে দিল যে, ভারতের রাজনীতিতে আঞ্চলিক নামের ‘আবেগী’ রক্ষাকবচগুলি এখন আর অপরাজেয় নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির এই জয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বাংলায় বিজেপির এই জয় আসলে তাদের এক দশকের রাজনৈতিক পরিকল্পনার ফসল। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতনের পর থেকে বিজেপি ধীরে ধীরে রাজ্যে তাদের ভোটব্যাংক বাড়িয়ে ৩৯ শতাংশে নিয়ে গিয়েছিল। আর এই নির্বাচনে তারা সেই গণ্ডি পেরিয়ে ৪৫.৮৪ শতাংশের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
কীভাবে বাড়ল প্রায় ৭ শতাংশ ভোট? কীভাবেই বা পতন হল তৃণমূল কংগ্রেসের? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পরাজয়ের কারণগুলি একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়। জোড়াফুল শিবিরের রাজনীতির মূল স্তম্ভ ছিল দু’টি—মহিলা ভোটারদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং একটি অত্যন্ত শক্তিশালী তৃণমূল স্তরের সংগঠন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগঠনই দলের জন্য হয়ে উঠল ‘অ্যাকিলিস হিল’। গোদা বাংলায় ‘মরণফাঁদ’। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে রেশন কেলেঙ্কারি—একের পর এক ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির অভিযোগে সরকারের ভাবমূর্তিতে কালির ছিটে লেগেছিল। অন্যদিকে, আর জি কর কাণ্ডের মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে মহিলাদের একাংশের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছিল। এই সমস্ত ইস্যুতেই বারংবার উত্তাল হয়েছে গ্রাম থেকে শহরের রাজপথ। আবার, মহিলা ভোটারদের মন জয়ের লক্ষ্যে তৈরি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, বিধবা ভাতা বা বয়স্ক মানুষজনের জন্য বার্ধক্য ভাতার মতো প্রকল্পকে একটা সময়ের পর মানুষজন আর ‘উপহার’ হিসাবে নয়, বরং ‘প্রাপ্য’ বলে দেখতে শুরু করে। প্রতি মাসে নিয়ম করে ভাতা দেওয়া সত্ত্বেও বেকারত্ব বা নিয়োগ দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলি যখন চোখের সামনে এসে পড়ে, তখন শুধু অনুদান দিয়ে আর ক্ষোভ ঢাকা সম্ভব হয় না। আর সেই কারণেই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি বেকার ছেলেমেয়েদের মন জয়ের জন্য যুবসাথী প্রকল্প চালু করা হলেও ‘ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স’ থেকে যে পরিমাণ লাভের অঙ্ক তৃণমূল খাতায় কলমে কষেছিল, ইভিএমে সেই প্রভাব পড়েনি। উলটে ভোটে বেকারত্বের মতো ইস্যুতে যুব সমাজের ক্ষোভের সুফল পেয়েছে বিজেপি। তবে শুধু তৃণমূলের ব্যর্থতার উপর ভরসা করে নয়, নিজেদের শক্তি বিচার করেও এবারে রণকৌশল সাজিয়েছিল পদ্মশিবির। প্রচার পর্বে তাদের মূল অস্ত্র ছিল দু’টি— ধর্মীয় মেরুকরণ ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি। বিজেপি এই নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে (সম্ভবত ২০২১ সালের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে) তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতাগুলিকে জনসমক্ষে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। আবার তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক রাজনীতির মোকাবিলায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বিকল্প হিসাবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের প্রচার করে বিজেপি। সেখানে প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যার প্রভাব পড়ে তৃণমূলের সুসংগঠিত নারী ভোটব্যাংকে। পাশাপাশি, বেকার ভাতা ও বার্ধক্য ভাতার পরিমাণ ডবল করে দেওয়ার আশ্বাস, নিয়োগে অনিয়মের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের জন্য ৫ বছরের বয়সের ছাড়, সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে ১ কোটি চাকরি, ৪৫ দিনের মধ্যে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দেওয়া এবং সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের মতো প্রতিশ্রুতি বিজেপিকে এবারের ভোটে আমজনতার পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতী ও সরকারি কর্মীদের কাছে তৃণমূলের থেকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিজেপির তূণের সবথেকে শক্তিশালী হাতিয়ার—মেরুকরণ। তৃণমূলের সঙ্ঘবদ্ধ মুসলিম ভোটব্যাংকের বিপরীতে হিন্দু ভোট সুসংগঠিত করাই ছিল বিজেপির অন্যতম প্রধান অস্ত্র। পশ্চিমবঙ্গের ২৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা বরাবরই তৃণমূলের তুরুপের তাস। বিজেপি এই অঙ্কটিকে চ্যালেঞ্জ করে ‘হিন্দু কনসলিডেশন’ বা হিন্দু ভোট একত্রীকরণের মাধ্যমে। বিজেপির শীর্ষ স্তর থেকে নীচুতলার নেতা কর্মীরা বঙ্গবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তৃণমূলের রাজনীতি শুধুই তোষণের রাজনীতি। এই বদ্ধমূল ধারণা হিন্দু ভোটারদের বড়ো অংশকে বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণকে রাজনীতির মূল কেন্দ্রে নিয়ে এসে অন্যান্য সমস্ত আঞ্চলিক বা ভাষাগত পরিচয়কে গৌণ করে দিতে পেরেছে বিজেপি।
এবারের ভোটপর্বের আগে থেকেই এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী এবং সুশীল সমাজের একাংশ অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের মধ্যে বড়ো অংশই প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এরই প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। আবার তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা ভোটপ্রচারে নিরন্তর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। যাতে ১৫ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতাকে ছাপিয়ে সংখ্যালঘু সহ সাধারণ মানুষের ভোট (ভয়ের অথবা ভক্তির) তৃণমূলের দিকে আসে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, বাস্তবে তা পুরোপুরি হয়নি। যদি জয়ের ব্যবধান খুব কম হত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই এই বিতর্ক মাথাচাড়া দিত। কিন্তু বিজেপির ৪৫.৮৪ শতাংশের বিশাল ভোট শেয়ার প্রমাণ করে যে, এই জোয়ার শুধু যান্ত্রিক নয়, বরং এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনমত। শাসকদলের দাপটে গ্রামের পাশাপাশি শহরের বহু আবাসনের মানুষও একাধিকবার ভোট দিতে পারেননি। এবারে কার্যত নীরব থেকে (সাইলেন্ট ভোটার) সেই অংশের মানুষজন ভোট দিয়েছেন। এবং তা গিয়েছে তৃণমূলের বিপক্ষে। আবার এসআইআর পরবর্তী ভোট হওয়ায় পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড়ো অংশ বিভিন্ন রাজ্য (কেউ কেউ বিদেশ থেকে) থেকে ভোট দিতে এসেছিলেন। প্রচার পর্বে দেশের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে অত্যাচারের প্রসঙ্গ তুলে এনেছিল তৃণমূল। কিন্তু ‘বাঙালি অস্মিতা’র সেই বক্তব্যও সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি।
অন্যদিকে, তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের নেতৃত্বে টিভিকে-র উত্থান এবং ডিএমকে-র আধিপত্যে ফাটল দ্রাবিড় রাজনীতিতে অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী। তামিলনাড়ুর মতো শিল্পোন্নত ও সচেতন রাজ্যেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে গভীর অসন্তোষ ও অস্থিরতা কাজ করছে, এই ফলাফল তারই প্রমাণ। আবার কেরলমে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ-এর জয় বামপন্থী শাসনের শেষ সলতেটি নিভিয়ে দিয়েছে। একটা বিষয় স্পষ্ট যে, ভোটাররা এখন আর শুধু ‘আঞ্চলিক গর্ব’ বা ‘পুরানো আইকন’-এর উপর ভিত্তি করে ভোট দিচ্ছে না। কংগ্রেস, তৃণমূল বা বামপন্থীরা ভেবেছিল, আঞ্চলিক পরিচয় হিন্দুত্ববাদী আদর্শের বিরুদ্ধে এক অভেদ্য দেওয়াল হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ‘কালী’ বনাম ‘রাম’-এর লড়াইয়ের মতো কৃত্রিম সাংস্কৃতিক আখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
কিন্তু দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কেন বেশি তাৎপর্যপূর্ণ? কারণ, বাংলা ছিল বিজেপির কাছে একটি ‘মতাদর্শগত সীমানা’। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ জয়ের পথে শেষ কাঁটা। আর সেই কারণেই নির্বাচনি প্রচারে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি রাজনাথ সিং, যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো হেভিওয়েট নেতা বা মৈথিলী ঠাকুরের মতো জনপ্রিয় গায়িকা-বিধায়ককে আনতেও কসুর করেনি তারা।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে বঙ্গ জয়ের ফলে দলে মোদি-শাহ জুটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হল। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। কারণ বাংলার এই প্রচার অভিযানের মূল কান্ডারি ছিলেন তিনি স্বয়ং। এই জয় যেমন শাহের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে মজবুত করল, তেমনই দলের মধ্যেও তাঁর কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় হল। সেই সঙ্গে আরও একবার প্রমাণ হল যে, সঠিক রণকৌশল এবং নিরন্তর পরিশ্রমে যে কোনো রাজনৈতিক দুর্গই জয় করা সম্ভব। বিজেপির এই বিপুল জয়ের সঙ্গেই ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর একটি দীর্ঘ ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। যখন একটি রাজনৈতিক দল এবং একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ (পড়ুন, হিন্দুত্ব) নিরঙ্কুশ আধিপত্য পায়, তখন ভিন্নমত বা প্রতিবাদের সুরগুলি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। বাংলার ইতিহাস বলে, এখানে ক্ষমতাচ্যুত দলগুলি খুব দ্রুত প্রাসঙ্গিকতা হারায়। ফলে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এখন বড়োসড়ো অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ভোট শতাংশ সামান্য বাড়লেও বামেদের এখনও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক না হয়ে ওঠা এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বহীনতা বিরোধী পরিসরের সেই শূন্যস্থান পূরণে ব্যর্থ। যার পুরো সুবিধা পাবে বিজেপি।
বাংলার এই রাজনৈতিক পালাবদল শুধু একটা সরকারের পরিবর্তন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। দীর্ঘ সময় ধরে যে ‘বাংলা মডেল’ বা ‘বাঙালিয়ানা’র দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক একাধিপত্য বজায় রাখা হয়েছিল, তা আজ প্রশ্নের মুখে। আধুনিক ভোটাররা কেবল ভাবাবেগ নয়, বরং স্বচ্ছ প্রশাসন, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তা চান।
বিজেপির সামনে এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ—তারা কি পারবে বাংলার সেই পুরানো ‘বাঙালিয়ানা’র আভিজাত্যকে ধরে রেখে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাজ্য গড়ে তুলতে? নাকি তারা দিল্লি বা লখনউ মডেলের আদলে বাংলাকে চালাতে চাইবে।
বাংলার জনতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে জিতিয়েছে। এখন বিজেপির দায়িত্ব, সেই আস্থার মর্যাদা দেওয়া। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান যেমন এক যুগের শেষ, তেমনই এটি বিজেপির কাছে এক নতুন অগ্নিপরীক্ষা।