


আজ, ২ আগস্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মদিন। শুধু রসায়নই নয়, ছাত্রদের মন থেকে ধর্মান্ধতার মূল উপড়ে ফেলার শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন। এই মহান বিজ্ঞানীর কর্মকাণ্ড তুলে ধরলেন অনির্বাণ রক্ষিত।
রসায়নের ক্লাস চলছে। ছাত্রদের সামনে এক টুকরো হাড় হাতে নিয়ে বুনসেন বার্নারে পুড়িয়ে মুখে পুরে দিলেন। ছাত্রদের শেখালেন, এটা ক্যালশিয়াম ফসফেট। এছাড়া আর কিছুই নয়। সেটা কোন প্রাণীর হাড় তাও আর চেনার উপায় রইল না।
রসায়ন দিয়ে শুধু রসায়ন শিক্ষাই নয়, ছাত্রদের মনে ধর্মান্ধতার মূল উপড়ে ফেলার মন্ত্রটিও প্রবেশ করিয়ে দিতেন তিনি। যতটুকু দরকার, তার বাইরে কতটুকুই বা পড়ার আগ্রহ আছে আমাদের বইবিমুখ আগামীর? অথচ, বই পড়ার আগ্রহ থেকেই জন্ম হয়েছিল এই বাঙালি মনীষীর। নিজের সাফল্যকে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন সার্থকতার শিখরে। ছোট্ট বন্ধুরা, আমরা এতক্ষণ যাঁর কথা শুনছিলাম, তিনি হলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলাদেশের রাড়ুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা হরিশ্চন্দ্র রায় ও মাতা ভুবনমোহিনী দেবী। বাবা মায়ের আদরের সেই ছোট্ট ফুলু পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ‘মাস্টার অব নাইট্রাইটস’ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।
কলকাতায় শিক্ষাজীবন
প্রফুল্লচন্দ্র রায় কলকাতায় অ্যালবার্ট স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখান থেকে এন্ট্রান্স পাস করে ভরতি হন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে। ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়েও তাঁর ছিল সমান আগ্রহ। এ সময় তিনি পার্শ্ববর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজেও ‘বাইরের ছাত্র’ হিসেবে অধ্যাপকদের বক্তৃতা শুনতে যেতেন। সেখানেই তিনি প্রথম রসায়নে নিজের আগ্রহ টের পান। প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়নের অধ্যাপক স্যার আলেকজান্ডার পেডলার ল্যাবরেটরি ছাড়া শ্রেণিকক্ষেও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখাতেন। কিন্তু এতে প্রফুল্লচন্দ্রের মনোবাসনা কিছুতেই পূরণ হত না। কাজেই এক সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তাঁর বাড়িতে একটি ‘ল্যাবরেটরি’ স্থাপন করে সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা করতেন। একদিন অক্সিহাইড্রোজেন ব্লো-পাইপ নিয়ে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। অবশ্য, দুর্ঘটনার সময় তাঁরা দু’জনেই কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এভাবে রসায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তেই থাকে। কাজেই এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি ক্লাসে ভরতি হন। রাড়ুলিতে থাকার সময়ই লাতিন ও ফরাসি ভাষা তিনি শিখেছিলেন। কলেজ পাঠ্য হিসেবে সংস্কৃত ভাষাও তিনি শিখে ফেলেন। এর মধ্যে তিনি জানতে পারেন, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বিলেতে বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এই বৃত্তি পেতে হলে লাতিন, গ্রিক অথবা সংস্কৃত, ফরাসি অথবা জার্মান ভাষা জানা আবশ্যক ছিল। যেহেতু এই কয়টি ভাষা প্রফুল্লচন্দ্র জানেন, তাই তিনি এই পরীক্ষায় অংশ নেবেন বলে মনস্থির করেন এবং গোপনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কারণ, তিনি জানতেন সফল না হলে সহপাঠীরা তাঁকে এই জন্য উপহাস করবে। কিন্তু সে বছর বম্বের জনৈক পার্সি যুবক ও প্রফুল্লচন্দ্র রায় এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিলেতে শিক্ষালাভের সুযোগ পান। মা-বাবার সম্মতি নিয়ে তিনি পি কে রায়ের কনিষ্ঠ সহোদর দ্বারকানাথ রায়ের সঙ্গে ‘ক্যালিফোর্নিয়া’ নামের জাহাজে করে ৩৩ দিন পর ১৮৮২ সালের জানুয়ারি মাসে বিলেতে হাজির হলেন। জাহাজঘাট থেকে লন্ডনে পৌঁছান। সেখানে তখন জগদীশচন্দ্র বসু ও সত্যরঞ্জন দাশ তাঁদের অভ্যর্থনা জানান এবং থাকার ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে প্রফুল্লচন্দ্র চলে গেলেন তাঁর জন্য নির্ধারিত এডিনবরা কলেজে।
বিলেতেও দাপট
বৃত্তি নিয়ে জাহাজে চড়ে লন্ডন গেলেন প্রফুল্লচন্দ্র। কিছু দিন থাকার পরে গেলেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু গোল বাঁধল পোশাক নিয়ে। বিলিতি ওভারকোট, ‘টেইল-কোট’ তাঁর অপছন্দ। পছন্দ ছিল রাজা রামমোহন রায়ের চোগাচাপকান। তা-ই বানানো হল। কিন্তু ‘সরু ও পাতলা’ হওয়ায় এ জিনিসও খুব একটা গায়ে আঁটল না।
কিন্তু এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটল। আচমকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর লর্ড স্ট্যাফোর্ড হেনরি নর্থকোট ঘোষণা করলেন, ‘সিপাহি বিদ্রোহের আগে ও পরে ভারতের অবস্থা’ শীর্ষক বিষয়ে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হবে। রসায়নের পাঠ কিছু দিনের জন্য তুলে রেখে ইংরেজি ও ফরাসিতে লেখা বিভিন্ন বইপত্র, অর্থনৈতিক ইতিহাস প্রভৃতি পাঠ শুরু করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। মোট সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করা প্রবন্ধ জমা দিলেন তিনি। পুরস্কার না মিললেও এর মূল্যায়নে উইলিয়ম ম্যুর ও অধ্যাপক ম্যাসন লিখলেন, ‘আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ, যেটিতে মোটো আছে।...ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এটি শ্লেষপূর্ণ আক্রমণে পূর্ণ।’ এই প্রবন্ধের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। তবে ইতিহাসের পাঠ আপাতত মুলতবি রেখে ১৮৮৭-তে রসায়নে মৌলিক গবেষণার জন্য ডিএসসি উপাধি পান তিনি।
তবে তার পরেও কিছু দিন বৃত্তির টাকায় বিলেতে থাকলেন তিনি। উদ্দেশ্য, ‘হাইল্যান্ড’ ভ্রমণ। লক ক্যাটরিনে সাঁতার কাটেন, রাত্রিবাস করেন লক লোমন্ডের তীরের হোটেলে। আর মনে মনে হয়তো আওড়ান ছেলেবেলায় পড়া উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘টু এ হাইল্যান্ড গার্ল’ কবিতাখানি।
কিন্তু এ বার দেশে ফেরার পালা। দেশে ফিরে ভারতীয় শিক্ষা বিভাগে যোগ দেবেন, ইচ্ছে তেমনই। আলেকজান্ডার ক্রাম ব্রাউন, উইলিয়ম ম্যুরের সুপারিশ, চার্লস বার্নার্ডের চেষ্টা সত্ত্বেও তা সম্ভব হল না। শেষমেশ সেই সময়ে বিলেতে থাকা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি বাংলা শিক্ষা বিভাগে প্রফুল্লচন্দ্রকে নিয়োগের একটি সুপারিশপত্র পাঠালেন ডিরেক্টর আলফ্রেড ক্রফটের কাছে।
সেই চিঠির ভরসায়, কার্যত কপর্দকশূন্য অবস্থায় দেশে ফিরলেন প্রফুল্লচন্দ্র। দেশে ফিরেই তাঁর প্রথম কাজই হল, বিলিতি পোশাক ছেড়ে বন্ধুর কাছে ধুতি আর চাদর ধার নেওয়া!
কর্মজীবন ও গবেষণা
ইংল্যান্ড থেকে ফেরার কিছুকাল আগে ভারতে চাকরির জন্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির সঙ্গে দেখা করে বেশ কিছু প্রশংসা ও পরিচিতিপত্র সংগ্রহ করেন। কিন্তু দেশে ফিরে তেমন কোনো লাভ হল না তাতে। ১৮৮৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত পি সি রায়ের কোনো চাকরি হল না। সেই সময় তিনি জৈব রসায়ন নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে সময় কাটাতেন এবং প্রায়ই জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রীর আতিথ্য গ্রহণ করতেন। অবশেষে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের একটি অধ্যাপকের পদ তৈরি হল এবং মাসিক ২৫০ টাকা বেতনে প্রফুল্লচন্দ্র রায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে সেই পদে যোগ দিলেন। তিনি রসায়ন বিভাগের একতলা ভবনে কাজ শুরু করেন। এই ভবন আগে হেয়ার স্কুলের অংশ ছিল। ১৮৭০ সালে যশোর থেকে কলকাতায় এসে বালক ফুলু এই স্কুলের যে বেঞ্চে বসতেন, কী আশ্চর্য! ঠিক সেই ঘরে সহকারী অধ্যাপকের বসার স্থান নির্ধারিত হয়। ১৮৯৫ সালে তিনি মারকিউরাস নাইট্রেট (HgNO2) আবিষ্কার করেন, যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি তাঁর অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা তাঁকে ‘মাস্টার অব নাইট্রাইটস’ আখ্যায় ভূষিত করেন। এ ছাড়া পারদ সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতু আবিষ্কার করে তিনি রসায়ন জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। গবাদিপশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক অ্যাসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৮৯ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক ছিলেন।
এরপর ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সায়েন্স কলেজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, নীলরতন ধর, পুলিনবিহারী সরকার, রসিকলাল দত্ত, মেঘনাদ সাহা, শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক, বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদা, হেমেন্দ্রকুমার সেন, বিমানবিহারী দে, প্রিয়দাভঞ্জন রায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল দে, প্রফুল্লকুমার বসু, বীরেশচন্দ্র গুহ, অসীমা চ্যাটার্জি প্রমুখ।
বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা
১৮৯৩ সালে পি সি রায় নিজের ল্যাবরেটরিতে ব্রিটিশ কোম্পানি ফার্মাকোপিয়ার একটি ওষুধ তৈরির ব্যবস্থা করেন। এর থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস। এটি শুরু হয় পি সি রায়ের ৯১, আপার সার্কুলার রোডের বাসভবনের পাশে। পরে ১৯০১ সালে কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে তা স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে এটি শেয়ারবাজারেও তালিকাভুক্ত হয়। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে এটিই কোনো বাঙালির প্রতিষ্ঠিত প্রথম কোনো শিল্পকারখানা।
শেষ কথা
১৯৪৪ সালের ১৬ জুন। প্রয়াত হন অকৃতদার এই মনীষী। কিন্তু তাঁর প্রয়াণের পরে, এমনকি তাঁর জীবিত অবস্থাতেও বাঙালি, ভারতীয়রা কতটা রক্ষা করতে পেরেছে প্রফুল্ল-ঐতিহ্য? জীবিত অবস্থায় তাঁর শেষ জন্মদিন পালিত হয় মেঘনাদ সাহার উদ্যোগে। কিন্তু এ জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছিলেন। আর প্রফুল্লচন্দ্রের মৃত্যুর পরে তাঁর সাধের শিল্প প্রতিষ্ঠানটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসে!