


রতনতনু ঘাটী: বার ক্লাস ফোরে উঠেছে বিতান দত্ত। ক্লাস থ্রি থেকে ফার্স্ট হয়েছে। তাই বেশ ক’টা গিফট পেয়েছে। আজকাল ছোটদের গিফট দিতে গেলে প্রথমেই বইয়ের কথা মনে পড়ে বড়দের। কেউ আর টয় বা গেম দেন না। নুটুকাকু বিতানের বাবার অফিসের বন্ধু। স্কুলে বিতানের রেজাল্ট বেরিয়েছে। বিতান ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে বলে বাবার মুখে খবর পেয়েছেন নুটুকাকু। এ খবর শুনেই তিনি বাড়িতে এসে হাজির। হাতে একখানা প্যাকেট।
বাড়িতে ঢুকেই বিতানকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘কই গো, বিতানবাবু, তোমার জন্যে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার গিফট!’
বিতান নুটুকাকুর হাত থেকে প্যাকেট নিতে নিতে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কল!’
তারপর প্যাকেটটা খুলে অবাক। বিতান তো এই বইটারই স্বপ্ন দেখেছে আজ ভোরবেলাই। স্বপ্নে তার পড়ার টেবিলে এই বইটাই পড়ে ছিল— লীলা মজুমদারের লেখা ‘হলদে পাখির পালক’! এই বইটার গল্পই ক্লাসে বলেছিলেন সেদিন রুম্পা ম্যাম। সকলে ক্লাসে একসঙ্গে বলেছিল, ‘গল্পটা দারুণ ম্যাম!’
এরপর বাবা অফিস থেকে বাড়িতে এসে ঢুকলেন। তাঁর হাতে একটা বই—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’। এই গল্পটা নিয়ে সিনেমা হয়েছে। একদিন মা-বাবার সঙ্গে বিতানও ছবিটা দেখেছে। জারোয়া আইল্যান্ডে কাকাবাবুদের অ্যাডভেঞ্চার। বাবা বলেছিলেন, ছবিটা পরিচালনা করেছেন বিখ্যাত পরিচালক তপন সিনহা।
মাকে চেঁচিয়ে বলল বিতান, ‘মা দেখবে এসো! আমি ফার্স্ট হয়েছি তো! কাকু আর বাবার কাছ থেকে এক্ষুনি দুটো বই গিফট পেয়ে গেলাম!’
মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই দুটো বই ধরলে তোর লাইব্রেরিতে কতগুলো বই হল শুনি?’
বিতান গর্বের গলায় বলল, ‘তিপান্নটা!’ যখন বিতান ক্লাস থ্রি থেকে ফার্স্ট হয়ে ফোরে উঠেছিল, সেদিনও অনেকগুলো বই গিফট পেয়েছিল। রুনুমাসি কী একটা কাজে দেওঘর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। নিউটাউনে ওঁর অফিস। অফিস থেকে ফেরার পথে একটা বই এনেছিলেন বিতানের জন্যে। বইটার নাম ‘ঘনাদা আইসক্রিম খায় না’। প্রেমেন্দ্র মিত্রর লেখা।
দারুণ মজাদার বই। মোট তিনবার বইটা পড়েছে বিতান। কারণ, বিতান নিজে আইসক্রিম খেতে দারুণ ভালোবাসে কি না! ওর ক্লাসের বন্ধু মধুরিমাকে বলেছে, ‘তুই এবার কলকাতা বইমেলায় গেলে মনে করে এই বইটাই কিনবি!’ ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছে মধুরিমা।
বিতান ক্লাসে ফার্স্ট হলে বই গিফট পায়। এ ছাড়া জন্মদিনে, পাড়ার ‘ছন্দলোক’ ক্লাবে আবৃত্তি করে নয়তো বিতর্কে যোগ দিয়ে অনেক বই গিফট পেয়েছে। এ ছাড়াও যে কোনও আনন্দ-অনুষ্ঠানেও উপহার হিসেবে বই নিতে চায় সে।
এবার বইমেলায় আরও ক’টা বই কিনেছিল বিতান। মা সেদিন অইডিয়াটা দিলেন, ‘বিতান, তোর সব মিলিয়ে গিফট পাওয়া বইয়ের সংখ্যাটা তো কম হল না! তুই বরং একটা লাইব্রেরি করে ফেল। লাইব্রেরিটার নাম রাখিস— বিতানের লাইব্রেরি!’
মায়ের কথাটা দারুণ মনে ধরল তার। সন্ধেবেলা বাবা অফিস থেকে বাড়িতে ফেরার পর বিতান লাইব্রেরির প্ল্যানটা বাবাকে বলল। লাইব্রেরির নামটাও বলল। বাবা শুনে বললেন, ‘গুড আইডিয়া! নামটাও ভারী সুন্দর! তোমার যেসব বন্ধু বাড়িতে আসে, তাদের তোমার লাইব্রেরির মেম্বার করে নিও! আমি তোমাকে কয়েকটা টফি এনে দেব। লাইব্রেরির একটা নিয়ম হবে— বন্ধুরা যারা প্রথম তোমার লাইব্রেরির মেম্বারশিপ নেবে, তারা একটা করে টফি পাবে!’
বাবার এই প্ল্যানটাও ভারী মনে ধরল বিতানের। মা রান্নাঘর থেকে বিস্কুটের একটা খালি বয়াম এনে বিতানকে দিয়ে বললেন, ‘এটাই হবে তোমার টফির ভাণ্ডার!’
পরদিন ছিল রোববার এবং পঁচিশে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। বাবা বাজার করতে গিয়ে কিনে আনলেন দামি টফির একটা প্যাকেট। বিতানই বয়ামে টফিগুলো ভরে নিল। মা বললেন, ‘আজকের দিনটা মস্ত একটা বড়দিন! বিতান, আজই তোমার লাইব্রেরির উদ্বোধন হয়ে যাক! আজ আমাদের পাড়ার ইচ্ছেখুশি সঙ্ঘের রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠান হবে। ওখান থেকে তোমার বন্ধুদের লাইব্রেরি উদ্বোধনে ডেকে এনো!’
বিতান বয়ামের গায়ে কাগজে লিখে আঠা দিয়ে সেঁটে দিল ‘লাইব্রেরির মেম্বারশিপ নিলে একটা টফি গিফট’! অনেক বন্ধুই এল বিতানের ডাকে। কলকাকলি বসু, দেবকীনন্দন দত্ত, অনিকেত সমাদ্দার, টুইঙ্কল সেন, অরুণাভ মিত্র, বীতশোক সান্যাল, মনময়ূরী মুখার্জি— আরও কতজন। বিতান সকলের হাতে একটা করে টফি তুলে দিল। সকলে ঝুঁকে পড়ে বইয়ের তাকের বইগুলো দেখতে লাগল। প্রত্যেকে একটা করে বই ইস্যু করে নিতে চাইল।
বিতানকে একটা রেজিস্টার খাতা বাবা কালই এনে দিয়েছিলেন। সেই খাতায় বিতান এক-একজনের নাম এন্ট্রি করে বই ইস্যু করতে লাগল।
সেদিন থেকে বিতানের লাইব্রেরি দারুণ চলছে।
এবার পঁচিশে বৈশাখের দিন বিতান বাবাকে ডেকে বলল, ‘বাবা, আজই তো আমার লাইব্রেরির জন্মদিন! আমাকে বই গিফট করবে না? মা, তুমিও একটা বই গিফট কর!’
বাবা চটপট বাজারে বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন দুটো বই কিনে নিয়ে। বিতানের হাতে বই দুটো দিয়ে বাবা বললেন, ‘বিতান, এই নাও, তোমার লাইব্রেরির জন্মদিনে আমার আর তোমার মায়ের গিফট।’
বিতান এখন ভীষণ ব্যস্ত। ‘ইচ্ছেখুশি সঙ্ঘে’র পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানের পর বিতানের লাইব্রেরির মেম্বাররা তাদের বাড়ি থেকে জমে থাকা নানা অকেশনে গিফট পাওয়া বইগুলো এনেছে ব্যাগে ভরে।
মনময়ূরী মুখার্জি বলল, ‘বিতান, এবার থেকে আমার গিফট পাওয়া বইগুলো তোর লাইব্রেরিতে থাক! সকলে ইস্যু করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পড়তে পারবে। তারপর পড়া হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে নতুন বই নিয়ে যাবে! খুব মজা হবে, তাই না? এবার থেকে ‘বিতানের লাইব্রেরি’টাই হবে আমাদের সকলের লাইব্রেরি!’
মনময়ূরী তার নিয়ে আসা বইগুলো বিতানের হাতে তুলে দিল। একে একে সকলে তাদের বইগুলো বিতানের হাতে তুলে দিতে লাগল। ভীষণ ব্যস্ত হাতে সকলের বইগুলো এন্ট্রি করে রাখতে রাখতে বিতান তার বাবা-মায়ের দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোমরা তো আমার মেম্বারদের সকলের শেষে এসেছ, তোমাদের বইগুলো তাই সব শেষে এন্ট্রি করছি, কেমন?’
বিতানের বাবা-মা বিতানের ব্যস্ততা দেখে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। বাবার দিকে তাকিয়ে মা বললেন, ‘দেখ, দেখ, আজ আমাদের ‘বিতানের লাইব্রেরি’টা কেমন জমজমাট!’