


সত্যিই কি তিনি পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলেছিলেন? কিন্তু যাতে হিটলারের হাতে তা না পড়ে তাই চুপ করেছিলেন! বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ সম্পর্কে জানালেন মৃণাল শীল।
পদার্থ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম আর্নল্ড সমারফিল্ড। ১৯১৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য ৮৪ বার এই বিজ্ঞানীর নাম মনোনীত হয়েছিল, কিন্তু একবারের জন্যও তাঁর ভাগ্যে নোবেল প্রাইজ জোটেনি। কিন্তু তাঁর ছাত্ররাও প্রায় সকলেই নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। তবে আজকের ঘটনা সমারফিল্ডকে নিয়ে নয়, তাঁর এক কৃতী ছাত্র ওয়ার্নার হাইজেনবার্গকে নিয়ে।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সময়টা পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম মেকানিক্স শাখার উত্থানের সময় বললে খুব একটা ভুল কিছু হয় না। ১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর জার্মানির উত্তর বাভারিয়ার উরজবার্গে জন্মগ্রহণ করেন ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ। ছোটোবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী ছিলেন তিনি। বলাবাহুল্য ১৯৩২ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বস্তুত হাইজেনবার্গকেই ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’-এর জনক বলে মান্যতা দেওয়া হয়।
এই সময়টা জার্মানির তথা গোটা বিশ্বের ইতিহাসে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হন অ্যাডলফ হিটলার। জার্মানির সর্বেসর্বা হয়েই শুরু করলেন দেশ থেকে ইহুদি নিধন এবং বিতাড়ন। যে কারণে এই সময়ে বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে জার্মানি ছাড়তে হয়েছিল। এই সময়ে হাইজেনবার্গ হিটলারের ইহুদি বিরোধী নীতির বিপক্ষে বলে বসলেন, ‘বিজ্ঞানী যদি ইহুদিও হন, তবুও তাকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অবশ্যই শিক্ষকতা করতে দেওয়া উচিত।’ এই বক্তব্যের জন্য হাইজেনবার্গ নাৎসিদের প্রবল রোষানলে পড়েন। এই সময় জার্মান পদার্থবিদদের মধ্যে ‘ডুয়েটসে ফিজিক’ বা ‘জার্মান ফিজিক্স’ নামের একটা আন্দোলন চলছিল। এই আন্দোলনে যাঁরা শামিল হয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই নাৎসি মনোভাবাপন্ন ছিলেন। এই আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র হেনরিক হিমলার তাঁর পত্রিকায় হাইজেনবার্গকে একজন ‘শ্বেতাঙ্গ ইহুদি’ বলে চিহ্নিত করেন। এর ফলে হাইজেনবার্গের জীবনে এক বড়োসড়ো বিপর্যয় নেমে আসে। হিটলারের দল তাঁর গতিবিধি জানতে গুপ্তচর নিয়োগ করে। এই সময় সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন হাইজেনবার্গের মা আনা ওয়েইক্লেন। কারণ হাইজেনবার্গের মা ছিলেন হেনরিক হিমলারের মায়ের পরিচিত। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটে হাইজেনবার্গকে হিমলারের দেওয়া একটা ঠান্ডা হুমকি চিঠির মাধ্যমে। যেখানে বলা হয়েছিল, হাইজেনবার্গ যেন তাঁর মুখের ভাষায় লাগাম দেন। জার্মানির ইতিহাসে এই ঘটনাটিকে ‘হাইজেনবার্গ অ্যাফেয়ার’ নামে আখ্যা দেওয়া হয়। এরপর ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি থেকে বিতাড়িত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নীতি নিয়ে আমেরিকায় শুরু হয় পারমাণবিক বোমা বানানোর যজ্ঞ— ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’। এই সংবাদে ভীত হিটলার শেষ পর্যন্ত শরণাপন্ন হন একসময়ের বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন হাইজেনবার্গের। কিন্তু হাইজেনবার্গ সত্যিই হিটলারের অনুরোধকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। ১৯৪২ সালে জার্মান সরকারের সামনে এক লেকচারে হাইজেনবার্গ বলেন, ১৯৪৫ সালের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট টাকা এবং জনবল জার্মানির নাই। হাইজেনবার্গের এই বক্তব্যের মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই হিটলার কোটি কোটি টাকার বন্দোবস্ত করে দেন হাইজেনবার্গকে। ওদিকে এই ঘটনার খবর পেয়ে ঘুম উড়ে যায় আমেরিকার। রেষারেষি চলতে থাকে আমেরিকা আর জার্মানির মধ্যে। এই সময় সুইৎজারল্যান্ড ছিল নিরপেক্ষ দেশ। সেখানে আমেরিকান, জার্মান সকলেরই প্রবেশাধিকার ছিল। ১৯৪৪ সালে সুইৎজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় আমেরিকা, জার্মান উভয় দেশ থেকেই বিজ্ঞানীরা যোগদান করেন। এই আলোচনাসভায় আমেরিকা একজন বেসবল খেলোয়াড় মোও বার্গকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠায়। উদ্দেশ্য ছিল, হাইজেনবার্গের পারমাণবিক বোমা তৈরির অগ্রগতি বিষয়ে জানা এবং তাঁকে হত্যা করা। কিন্তু সভায় হাইজেনবার্গ বলেন যে, পরমাণু বোমা তৈরির ব্যাপারে তাঁর গবেষণা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। হাইজেনবার্গের এই বক্তব্য শুনে মোও বার্গ হাইজেনবার্গে হত্যা না করেই ফিরে আসে। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল, জার্মানি তখন পরাজিত এবং এক অর্থে গোটা পৃথিবীর ক্ষমতা তখন আমেরিকা আর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার মদতে জার্মানির পরমাণু গবেষণার অগ্রগতি বুঝতে ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তার করা হল হাইজেনবার্গকে। কিন্তু অন্য বন্দিদের যেরকম অত্যাচারিত হতে হয় সেরকম কিছুই করা হয়নি হাইজেনবার্গকে। বরং হাইজেনবার্গ সহ বেশ কিছু জার্মান বিজ্ঞানীকে ‘ফার্ম হল’ নামক এক গোপন জায়গায় অত্যন্ত যত্নের সঙ্গেই রাখা হয়। এই স্থানে বিজ্ঞানীদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথন রেকর্ড করার জন্য রাখা হয়েছিল গোপন রেকর্ডার। সেই রেকর্ডারের তথ্য থেকে জানা যায়, হাইজেনবার্গ সত্যিই অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন পারমাণবিক বোমা নির্মাণের কাজে। কিন্তু তিনি জানতেন এই বোমা গোটা বিশ্বের কাছে কতটা ভয়ানক হতে পারে! তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই পরমাণু বোমা তৈরির ফর্মুলা সম্পূর্ণ করেননি। এ কথা জানার পর হাইজেনবার্গকে ১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর তিনি ফের নিজের দেশ জার্মানিতে ফিরে আসেন। হাইজেনবার্গ একসময় ভারতেও এসেছিলেন। ১৯২৯ সালের ৪ অক্টোবর তরুণ হাইজেনবার্গ কলকাতায় আসেন। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ভাগ্নে দেবেন্দ্রমোহন বসু ছিলেন তাঁর পূর্ব পরিচিত। যদিও হাইজেনবার্গের কলকাতায় আসার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করা। কবি সম্পর্কে হাইজেনবার্গ প্রথম শোনেন তাঁর অধ্যাপক ম্যাক্স বর্নের স্ত্রী হেডভিগের কাছে। এছাড়াও তাঁর মা-বাবার সঙ্গে তিনি মিউনিখে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতাও শুনতে গিয়েছিলেন। সেই সময় হাইজেনবার্গের মা আনা বলেছিলেন যে, ‘এই ভারতীয় কবিকে দেখতে ঠিক প্রভু যিশুর মতো।’ হাইজেনবার্গ নিজেও দেখেছেন, জার্মানিতে কবির বক্তৃতা কিংবা অনূদিত কবিতাগুলো নিয়ে কী প্রবল উন্মাদনা। রোমান্টিকতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক আদর্শবাদ। সেই থেকেই রবি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। অবশেষে দেবেন্দ্রমোহন বসুর সৌজন্যে কবির সঙ্গে দেখা হয় হাইজেনবার্গের। তিনি স্বীকার করেছিলেন কবির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণের আলোচনা ছিল তাঁর জীবনে বেশ অর্থবহ। ১৯৭৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে।