


জয়তী রায়
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে রাজীব দেখল পম্পা মাসি এসেছে।
শিবেন স্যারের অঙ্ক ক্লাসের টিউশন করার মজাটা নিমেষে তেতো। মাসি নয় যেন মশা। নিজের দিদির ছেলের পিছনে কেন লাগে তার ব্যাখ্যা বাবা-মায়ের কাছে সরল— পম্পা তোর ভালো চায়।
হুঁ! ভালো চাওয়ার নমুনা এগুলো—।
—দিদি, তোমার ছেলে অঙ্কে সাতানব্বই পেয়েছে! ক্লাস টেন এখন। সাতাশ পেলে মাফ করা যায় কিন্তু সাতানব্বই?
—দিদি, তোমার ছেলে ভূতের গল্প পড়ছে? এ আই যুগ চলছে। এখন ভূত? আমি কথা বলব ওর ফেভারিট স্যারের সঙ্গে।
মা নরম সুরে বললেন— শিবেন স্যারের সঙ্গে একদিন তর্ক হয়ে যাক। কেক, কফি আর ভূত।
কাঁধের ব্যাগ দড়াম করে রাখে রাজীব। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে হয়েও সে কোনো ব্যাপারে জেদ করে না। পড়াশোনা ছাড়াও ক্রিকেট, সাঁতার, স্কেটিং যেমন করে তেমনই একটা দারুণ পছন্দের বিষয় ভূতের গল্প পড়া। মাসির রাগ ওটাতেই। কেন? রাজীব প্রতিবাদ করে— কেন? স্যার কি বেকার যে তোমার সঙ্গে তর্ক করতে আসবেন?
চোখ সরু করে মাসি হেসে উঠবে— বাব্বা! এদিকে অঙ্ক অন্যদিকে ভূত। জিনিয়াস বলতে হবে।
....
শিবেন স্যার মন দিয়ে শুনেছেন পুরো ব্যাপারটা। স্কুলে শিবেন স্যার জনপ্রিয় কারণ উনি অঙ্কের ক্লাসে গল্প করেন! স্যারের বয়স পঞ্চাশ। অবিবাহিত। লম্বা, শ্যামলা, বলিষ্ঠ চেহারা। মাথায় ঘন চুল। সবসময় হাসিমুখ। রাজীবদের ক্লাস টেনের ব্যাচ। মোট দশজনের একটা দল সপ্তাহে তিনদিন বাড়িতে আসে অঙ্ক করতে। তখন নানারকম গল্প করার সময় স্যার বলেছিলেন — ভূত বিশ্বাস করি। এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে বলতে পার আমি বাধ্য হয়েছি বিশ্বাস করতে।
—স্যার বলুন। স্যার বলুন।
—আরে, ব্যাপারটা ওইরকম নয়।
অভিজ্ঞতা হওয়ার আগে আমিও বিশ্বাস করতাম না। বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে কবরখানায় রাত কাটিয়েছি। কিন্তু, সেদিনের পরে...।
গল্পটা শুনিয়েছিলেন স্যার। বলার ভঙ্গিটা তো ভালো ছিলই কিন্তু বলতে বলতে নিজেও কেমন ভয় পাচ্ছিলেন। একটা বেদনার সুর বেজে উঠছিল গলায় — বিশ্বাস করা উচিত ছিল। রাজীব, অশরীরী আত্মা নিয়ে ব্যঙ্গ করা তোমার মাসি এবার এলে আগের থেকে খবর দিও। কেক আর কফি খেতে মন্দ লাগবে না!
....
সেদিন রবিবার। বিকেল থেকে আকাশের মুখ থমথম। চৈত্র-বৈশাখ মাসের এটাই সমস্যা। ঝড় কখন উঠবে বলা যায় না। এদিকে আজ আসবেন শিবেন স্যার। পম্পা মাসি যুদ্ধের জন্যে তৈরি। কেক এসেছে। কফির পট রেডি। সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা চলল রাত ন’টার দিকে। স্যারের দেখা নেই। মোবাইল বন্ধ। রে রে করতে করতে ঠিক ন’টায় এসে গেল ঝড়। জোরে বাজ পড়ল বাড়ির কাছেই। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে যখন চারদিক তখন দরজায় বাজল বেল।
ঝড়ের ধুলোয় উশকোখুশকো স্যার ঘরে ঢুকতেই বিকট শব্দে আবার বাজ পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরের লাইটগুলো দপদপ করে নেভা জ্বলা করতে করতে একসময় স্থির হল।
মা ছুটে এসে বললেন, এ বাবা! মাথাটা ঝেড়ে নিন তোয়ালে দিয়ে। বৃষ্টি নেই বলে ভিজে যাননি।
বাবা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কী দরকার ছিল? ফোন করলেই তো পারতেন।
স্যার বললেন, আরে, বাড়ির সামনে এসে পড়েছি। আর ফিরে যাওয়া যায়। মোবাইল? বাজ পড়তেই সে ব্যাটা বন্ধ।
মাসি লজ্জার ভান করে বলল, আমি পম্পা। কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে রিসার্চ করছি।
স্যার চোখ বড়ো করে বললেন, ওরে বাবা। যাক গে, আরাম করে বসি। তারপর শুরু হোক তর্ক।
মাসি বলল, তর্ক কীসের? যা নেই তার গল্প পড়ে জীবনের অমূল্য সময় কেন নষ্ট করবে?
—যা নেই? দুদিন আগেও তো এআই ছিল গল্প কথা, তবে?
—না স্যার। ওটা রিসার্চ। অদেখা বস্তু নয়।
—অশরীরী আত্মা অদেখা কে বলল?
—নিজের চোখে দেখেছেন?
—দেখেছি।
মাসি দুম করে ঘুসি মারে টেবিলে— অ - সম্ভব। রাজীবের জন্যে বানিয়ে বানিয়ে...।
কথা শেষ হয় না। ঝড়ের শব্দ ছাপিয়ে কড়া গলায় বলে ওঠেন স্যার, মিথ্যা বলি না।
পরিস্থিতি সামলাতে মা কফি নিয়ে হাজির হয়ে বলেন, গল্পটা বলুন স্যার।
মাসি নিজেও বলল, সরি স্যার।
....
বাইরের ঝড়ের দাপট একই রকম। ড্রয়িং রুমে বসে আছে রাজীবের বাবা- মা সহ মোট পাঁচজন। সেন্টার টেবিলে কফি আর কেক। আলোগুলো একই রকম দপদপ করছে দেখে মাসি শৌখিন মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়ার ফলে দেওয়ালে ছায়া কেঁপে কেঁপে উঠছে। চারটি ছায়া। বন্ধ দরজা জানলা ভেদ করে একটানা শোঁ শোঁ শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে স্যার বললেন— তখন কত আর বয়স? তিরিশ হবে। মাস্টারের চাকরিতে সদ্য যোগ দিয়েছি। গণ্ডগ্রাম একেবারে। কম বয়সে কাদামাখা পথঘাট, খড়ের চালের বাড়ি— সবই ভালো লাগে। স্কুলে ছাত্র নেই। সবাই খেতে কাজ করতে যায়। ধরে বেঁধে ডিমের লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসি। মাস্টারের সংখ্যাও কম। মোটে তিনজন। একজন বুড়ো পণ্ডিত, অন্যজন শুভেন্দু। আমারই বয়সি। খুব জমে গেল দু’জনের। অন্ধকারে লণ্ঠন জ্বালিয়ে ভূতের গল্প করলেই শুভেন্দু ভয় পেত। আমি দাপুটে সাহসী। খুব পেছনে লাগতাম। গণ্ডগ্রামটায় সে বছর কলেরা হল। কে বা ওষুধ দেয়? কে বা ডাক্তার ডাকে? শহর থেকে ব্যবস্থা হতে হতে বেশ কিছু লোক মরে গেল, শুভেন্দু তার মধ্যে একজন! সে মরতে চায়নি। গরিব ঘরের একটি মাত্র রোজগেরে ছেলে। বড়ো বড়ো চোখ করে আমায় বলছিল, বাঁচিয়ে দে আমায়।
নাহ্। বাঁচাতে পারিনি। শ্মশানে দাহ করে ঘরে ফিরেছি। গভীর রাত। দরজা বন্ধ করে শুয়েছি। শুভেন্দু এল।
অনায়াসে এল। সুন্দর চেহারা। গলাটা একটু ধরা ধরা। সর্দি বসলে যেমন হয়। বলল— আমার ঘরের বালিশের মধ্যে কিছু টাকা আছে। মায়ের হাতে দিয়ে আসবি, শিবেন?
আমি ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলতে সে বেরিয়ে গেল।
কফির কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে স্যার বললেন— বিশ্বাস করা না করা তোমাদের ইচ্ছে।
রাজীব দেখল, তার ডাক্তার বাবা চুপ করে আছেন। কেবল পম্পা মাসির ঠোঁটে বিচিত্র হাসি। বিশ্বাস করেনি। সে বলল — স্যার, প্লিজ রাগ করবেন না। পুরোটাই আপনার মনের ভুল। শুভেন্দু টাকা কোথায় রাখত আপনি জানতেন। গরিব পরিবারের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে অবচেতন মনে ওইরকম দৃশ্য দেখেছেন।
—কী রকম দৃশ্য?
মুচকি মুচকি হাসছেন স্যার।
—ওই যে বন্ধ দরজা দিয়ে এল আবার দরজা না খুলে বেরিয়ে গেল।
কফির কাপ রেখে উঠে দাঁড়িয়েছেন স্যার। রাজীব দেখল দেওয়ালে ছায়া কাঁপছে। চারটি ছায়া। স্যার বলছেন, কেমন করে বেরিয়ে গেল শুভেন্দু? এমন করে?
সামনের দেওয়ালের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে স্যারের শরীর। ঢুকতে ঢুকতে মিলিয়ে যাচ্ছে পাঞ্জাবি, পাজামা। শোনা যাচ্ছে সর্দি বসা গলার হাসি— বাজ পড়ল ভাগ্যিস। হাতে গরম প্রমাণ দেওয়া গেল।
পম্পা চিৎকার করে পড়ে গেল। দেওয়ালে ছায়া কাঁপছে। চারটি ছায়া।