


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: যুদ্ধের শুরু থেকেই মোদি সরকারের অতি আত্মবিশ্বাসী আশ্বাস ছিল, জ্বালানি নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ভাণ্ডার পর্যাপ্ত। এখনও নাকি ৭০ দিনের জ্বালানি মজুত! অথচ, এলপিজি, সিএনজি, এলএনজি—সবরকম গ্যাসের সংকট চরমে। রান্নাঘর থেকে বাণিজ্য, কারখানা থেকে পরিবহণ। গ্যাস সংকটের আঁচে যতটা নাজেহাল সাধারণ মানুষ, ততটাই বেসামাল কেন্দ্রীয় সরকার। মুখে যাই দাবি করুক না কেন, পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক সেকথা অবশেষে উপলব্ধি করেছে মোদি সরকার। আর তার ফল, কেন্দ্রীয় তেল ও প্রাকৃতিক মন্ত্রকের একটি উচ্চপর্যায়ের রিভিউ কমিটি গঠন। এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, আচমকা জারি হয়ে যাওয়া কঠোর নিয়ন্ত্রণ। তাও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন ১৯৫৫’এর মাধ্যমে। মঙ্গলবার কেন্দ্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে, গ্যাস সহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহ, বণ্টন এবং মজুতদারি নির্দেশমতো কার্যকর হবে। সূত্র বলছে, গত ছ’মাসের গড় সরবরাহের ৭০-৮০ শতাংশ বর্তমানে পাবে সার কারখানা, বাণিজ্যিক প্রাকৃতিক গ্যাস উপভোক্তা, চা ও উৎপাদন শিল্প। তবে বাড়ি বাড়ি পাইপলাইন ও গাড়ির সিএনজি সরবরাহ ১০০ শতাংশ বহাল থাকবে। রিভিউ কমিটি নজরদারি চালাবে হোটেল, রেস্তরাঁ, শিল্পক্ষেত্র, হাসপাতাল এবং গৃহস্থের বাড়িতে। বৈধ সংযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সাপ্লাইয়ে দেরি বা ঘাটতি হলে তাহলে সংশ্লিষ্ট বণ্টনকারীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই আইনে কাজ না হলে দ্রুত ‘এসমা’ জারির হুঁশিয়ারিও দিয়েছে কেন্দ্র।
গ্যাস নিয়ে এদিন কার্যত হাহাকার শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন শহরের হোটেল-রেস্তরাঁগুলিতেও। বেঙ্গালুরুতে বিদ্যার্থী ভবনের মতো বড়ো বড়ো রেস্তরাঁয় মেনু থেকে দোসা-বড়া পর্যন্ত উধাও হয়ে যায়। বাণিজ্যনগরী মুম্বইতে ২০ শতাংশ হোটেল বন্ধ ছিল বলে দাবি মালিক সংগঠনের। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যে আগামী দু’দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ রেস্তরাঁ ঝাঁপ ফেলতে বাধ্য হবে। দিল্লি-গুরুগ্রাম-ওড়িশা-চেন্নাইয়েও এক পরিস্থিতি। দোকান কিংবা রাস্তার খাদ্য বিক্রেতাদের দ্বিগুণ দামে ক্রয় করতে হচ্ছে সিলিন্ডার। কমার্শিয়াল গ্যাসের আকাল নিয়ে কেন্দ্রীয় তেল ও গ্যাস মন্ত্রককে আপৎকালীন ভিত্তিতে চিঠি দিয়েছে হোটেল অ্যান্ড রেস্টোর্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন। সে সবও কঠোর নিয়ন্ত্রণের অন্যতম নেপথ্য কারণ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক এদিন নির্দেশিকা জারি করেছে তেল শোধনাগারগুলির উদ্দেশে। বলা হয়েছে, এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে এবং অতিরিক্ত উৎপাদন পৌঁছে দিতে হবে গৃহস্থ বাড়িতে। তবে ন্যূনতম ২৫ দিনের যে বুকিং সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, তাতে অবশ্য কোনো বদল করা হয়নি।
ভারত বছরে ৩ কোটি ১৫ লক্ষ টন এলপিজি ব্যবহার করে। এই চাহিদার মধ্যে ৮৭ শতাংশই সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে ব্যবহৃত হয়। এবং এই চাহিদা মেটানোর জন্য ৬২ শতাংশ ভরসা আমদানি। ভারত যত এলপিজি আমদানি করে, তার ৮০ শতাংশই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। আর রুট হল হরমুজ প্রণালী। এই ভৌগোলিক অঞ্চল ঘিরে আতঙ্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার ঢেউ ধাক্কা দিয়েছে ভারতের বাজারেও। তাই ভারত সরকার মরিয়া হয়েছে বিশ্বের জ্বালানি সাপ্লাই স্বাভাবিক রাখতে। আর সংকট তো শুধু রান্নাঘরের নয়! ইউরিয়া সার থেকে সেরামিকের মতো শিল্পক্ষেত্রেও। ফলে গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের একের পর এক ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ শিল্পক্ষেত্রে চাপ বাড়ছে।