


শুভজিৎ অধিকারী, শ্রীনগর: দৃশ্য এক: শ্রীনগর এয়ারপোর্ট। বেরনোর সময় কোনও চেকিং না হলেও চারপাশে ইনসাস হাতে নিরাপত্তারক্ষীরা। লাগেজ ডেসপ্যাচ টেবিলের সামনেই জম্মু ও কাশ্মীর পর্যটন দপ্তরের অভ্যর্থনা অফিসে বসে এক আধিকারিক। অথচ, পুরো অফিস ফাঁকা।
দৃশ্য দুই: এয়ারপোর্ট লাগোয়া পার্কিং জোনে সারি সারি গাড়ি। ভাড়া নেওয়ার লোক নেই। দু’একজন পর্যটকের দেখা পেলেই হামলে পড়ছেন চালকরা। চলছে দর কমানোর প্রতিযোগিতা।
দৃশ্য তিন: এয়ারপোর্ট রোড ধরে ডাল লেকের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দোকান, ক্যাফে, রেস্তরাঁর অর্ধেকই বন্ধ। কিছু দূর অন্তর ইনসাস কাঁধে খাকি উর্দিধারীরা। তাঁদের কঠিন চাহনি ও কাঁধে ইনসাস জানান দিচ্ছে ছন্দে ফিরতে মরিয়া ‘শ্রীহীন’ শ্রীনগর! গাড়ির চালক সোনু যেন সাহস জোগাতেই বললেন, ‘সব ঠিকঠাক দাদা... ভয় পাবেন না।’
পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকায় পাক জঙ্গিদের নারকীয় হত্যাকান্ডের মাসপূর্তিতে এই তিনটি দৃশ্যই কাশ্মীরের সার্বিক পরিস্থিতি বোঝাতে যথেষ্ট। গাড়ির চালক অভয় দিচ্ছেন, পর্যটন দপ্তরের কর্তা ‘নিউ নর্মাল’ বলে বার্তা দিচ্ছেন... কিন্তু হত্যালীলার ভিডিও যাঁরা দেখেছেন, সেই সমস্ত পর্যটক যে কতটা সাহসী হয়ে উঠবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না ভূস্বর্গের। ডাল লেকের পাড়ে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ দুপুরের খাওয়া সারছিলেন মনিরুল। খাওয়া বলতে দুটো বিস্কুট ও এক কাপ চা। সকাল সাতটা থেকে ১০এ ঘাটে বসে রয়েছেন। শিকারার জন্য একজনও যাত্রী মেলেনি। কথায় কথায় বলছিলেন, ‘সত্যিই ওই দৃশ্য ভোলার নয়! আমাদের কোমরটাই ভেঙে গিয়েছে। ফের সোজা হয়ে দাঁড়াতে কিছুটা সময় লাগবেই।’ সেই সময়টা কবে আসবে, তা অবশ্য ওপর ওয়ালার উপর ছেড়ে দিয়েছেন ডাল লেকে ভাসমান মিনা বাজারের কর্মী সইদ নাজির। দিনভর কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বিশাল শোরুম খুলে বসে রয়েছেন। কিন্তু বিক্রি নেই। দু’একজন আসছেন, দেখছেন, চলে যাচ্ছেন। তাঁদেরও চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। শিকারাকে ঘিরে জলে অনেক কিছুর ব্যবসা হয়। কেউ ভাজা মাছ বিক্রি করেন, কেউ কাশ্মীরি গয়না, কেউ ফল। অনেকে পর্যটকদের ছবি তুলে দেন। কেশর, সব্জি বিক্রি করেও সংসার চালান অনেকে। প্রায় ২২ বর্গ কিলোমিটারজুড়ে ডাল লেকের ব্যাপ্তি। সব মিলিয়ে দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষের রুজি-রুটি এই লেককে কেন্দ্র করে। অথচ পড়ন্ত বিকেলেও গোটা ডাল লেক ফাঁকা। নাজির বলছিলেন, ‘এখন কাশ্মীরে ভরা মরশুম। অন্য সময় হলে আপনার সঙ্গে এখন আমি কথা বলারই সময় পেতাম না। উপরওয়ালা আছেন। তিনি সব ঠিক করে দেবেন। কাশ্মীর এর আগেও অনেক ঝড় সামলেছে। এবারও সামলে উঠবে।’
‘আশা’। এই দুটো অক্ষরই ভূস্বর্গের বদনাম ঘোচাতে মূল ভরসা। তাতেই ভর করে বার বার ভেঙে দেওয়া মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়ান কাশ্মীরিরা।