


পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: উন্নয়নের নামে বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা ঠিক কীভাবে লুট করতে হয়, বীরভূম জেলা পরিষদ যেন তার এক নজিরবিহীন ‘উদাহরণ’ তৈরি করেছে। জেলা পরিষদের তহবিলে আসা পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের বিপুল সরকারি টাকা ঠিকমতো খরচ হয়েছে কি না, তা দেখতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় অডিট টিমের সদস্যরা। আর তাঁদের এই পরিদর্শনেই বীরভূম জেলা পরিষদের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির কঙ্কালসার চেহারাটা একেবারে বেআব্রু হয়ে গিয়েছে। অডিট টিমের পর্যবেক্ষণ, কোটি কোটি টাকা খরচে রাস্তা হয়েছে। অথচ বাস্তবে সেই রাস্তার হয় অস্তিত্বই নেই, অথবা বছর ঘোরার আগেই রাস্তার কঙ্কাল বেরিয়েছে। কাজের ন্যূনতম গুণমান যাচাই না করেই কীভাবে কোটি কোটি টাকার ‘ভুয়ো’ বিল পাশ করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সভাধিপতি এবং জেলাশাসক ধবল জৈনের কাছে কড়া জবাব তলব করেছে অডিট টিম।
গত ১৩ জুলাই ক্যাগের তিন সদস্যের বিশেষ দল জেলা পরিষদে হাজির হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের বিপুল টাকার হিসাব খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীদের রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ হয়। দুর্নীতির প্রথম নমুনা হিসেবে ২০২৪ সালে নানুরের চারকলগ্রাম মোড় থেকে পলিতা মোড় পর্যন্ত প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত পিচের রাস্তার কথা তুলে ধরেছে ক্যাগ। এই কাজের বরাত পেয়েছিল কাজলের আত্মীয়ের একটি সংস্থা। অডিট টিমের দাবি, পুরোনো রাস্তা ভাঙার নামে প্রায় ২১ লক্ষ টাকা এবং সুরক্ষার জন্য ‘সিল কোট’ দেওয়ার নামে প্রায় ৮ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা ঠিকাদারকে মেটানো হলেও বাস্তবে এই কাজগুলি হয়নি। প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার ভুয়ো বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা জেলা পরিষদের চরম আর্থিক দুর্নীতির এক নগ্ন প্রমাণ।
লুটের দ্বিতীয় নিদর্শন সভাধিপতির নিজের গ্রাম পাপুড়িতেই। পাপুড়ি থেকে সনসদ পর্যন্ত একটি রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য ৭৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কাজ পেয়েছিলেন আর এক আত্মীয় মহম্মদ সাদ্দাম। ২০২৫ সালের মে মাসে কাজ শেষ হয়েছে বলে কাগজে-কলমে দেখানো হলেও, অডিট টিম দেখেছে, বাস্তবে সেখানে রাস্তার কোনো অস্তিত্বই নেই! সাধারণ কাদামাটির রাস্তা, যেখানে একটি ইট পর্যন্ত মেলেনি! দুর্নীতির তৃতীয় নিদর্শনটি কীর্ণাহার-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ভদ্রকালীতলা থেকে সরডাঙা বড়ো বাগান পর্যন্ত প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার কংক্রিটের রাস্তা। কাজলের ঘনিষ্ঠ সংস্থার করা এই রাস্তাটি ২০২৫ সালের মে মাসে তৈরি হলেও ইতিমধ্যেই পাথর বেরিয়ে ফাটল ধরেছে। নির্মাণের সময় বেআইনিভাবে ঢালাইয়ের পুরুত্ব কমানো হয়েছে। এর ফলে রাস্তাটি কার্যত মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির জন্য আধিকারিক ও ঠিকাদারদের কড়া ভাষায় বিঁধেছে অডিট টিম। অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি, লুটের টাকা পুনরুদ্ধার এবং জনস্বার্থে রাস্তাগুলি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে মেরামত করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলাশাসক ধবল জৈন জানিয়েছেন, যেমন নির্দেশ এসেছে সেই অনুযায়ী কড়া পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু যাঁর নাকের ডগায় লুটের এই মহোৎসব, সেই সভাধিপতি কাজল শেখকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। মেসেজ করলেও উত্তর দেননি। নিজস্ব চিত্র