


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ষ্ট্রশক্তির নতি স্বীকার। যুবশক্তির বিজয়গর্জন। ৫০ দিনের লড়াইয়ের পর জয়ী হল ভারতের ছাত্র-যুবসমাজ। পরাজিত সংসদীয় গরিষ্ঠতা, পুলিশি হামলা, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, দেশদ্রোহী ‘তকমা’ এবং সরকারের জেদ। ‘জেন জি’ নামক অনমনীয় এক স্নায়ুর কাছে আত্মসমর্পণ করল রাজনৈতিক অতি-আত্মবিশ্বাসের ‘পাওয়ার করিডর’। নোটবাতিল, এনআরসি, সিএএ, এসআইআর ছিল নাগরিকত্ব রক্ষার লড়াই। কিন্তু সংঘর্ষ, সংঘাত, মৃত্যুর পরও পিছু হটেনি মোদি সরকার। এবার সেই প্রবল ক্ষমতা নত হল ছাত্র-যুবশক্তি ও তারুণ্যের সম্মিলিত হুংকারের সামনে। অবশেষে পদত্যাগ করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। গত ৬ জুন দিল্লির যন্তরমন্তরে যে আন্দোলন ছিল ককরোচ জনতা পার্টির এক অনলাইন ক্যাম্পেনের জেরে বিক্ষোভের ক্ষুদ্র বহিঃপ্রকাশ, ৪৯ দিন ধরে ক্রমেই তা দেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে রূপ নিয়েছিল গণবিদ্রোহের। ৫০তম দিনে এল সাফল্য। ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে শনিবার দুপুরেই নির্ধারিত ছিল সরকারপক্ষের বৈঠক। তার প্রাক্কালে আচমকা ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। শুধু তা-ই নয়, পরে ওই বৈঠকে বিক্ষোভকারীদের সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হল কেন্দ্র।
এই প্রথম কোনো অরাজনৈতিক নাগরিক আন্দোলনের চাপে মোদি সরকারের এক ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হল। কিন্তু কেন? কোনো বৃহত্তর আশঙ্কায়? যত দিন যাচ্ছিল, নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবির পাশাপাশি ধীরে ধীরে নিশানায় আসছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। দিল্লির যুবশক্তির হুংকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ক্রমেই রাজ্যে, নগরে, গ্রামে। বৃদ্ধি পাচ্ছিল সরাসরি মোদির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। এদিন বিক্ষোভকারী ছাত্র সংগঠন আইসার তরফে অনশন করা ছাত্রীদের পাশে নিয়ে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী তো সরাসরি বলেই দেন, ‘নরেন্দ্র মোদি অতীত। ছাত্ররা ভবিষ্যৎ। অতীত কখনো ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জিততে পারে না। অতএব মোদিজি ক্ষমা চান। মোদিজি গোটা সিস্টেমের মাথায় বসে আছেন। অতএব দায় নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে তাঁকে।’ রাহুলের এই বক্তব্যের পরই যন্তরমন্তর থেকেও ককরোচরা বলে, ‘মোদিজি রিলস বানিয়ে লাভ নেই। ব্যবস্থা নিন।’ ক্রমশই বোঝা যাচ্ছিল, এরপর নরেন্দ্র মোদির দিকেই তির ঘুরছে। কারণ, ধর্মেন্দ্র প্রধান না হয় ইস্তফা দিতে নারাজ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কেন তাঁকে বরখাস্ত করছেন না? এই প্রশ্ন উঠছে। এদিন রাহুল গান্ধী ও ককরোচ জনতা পার্টির পৃথক বিবৃতি থেকেই হয়তো সরকার আভাস পেয়েছিল যে, এবার মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠতে পারে। তাই কি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, আন্দোলন সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই তড়িঘড়ি পদত্যাগ করলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান? যে প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া গেল না—সেই যখন ইস্তফা দিতেই হল, আরও আগে নয় কেন?
এতদিন নিট বিতর্ক নিয়ে ছাত্রসমাজের সঙ্গে পাঁচটি বাক্যও বিনিময় করেননি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু তাঁর ইস্তফাপত্র দুই পৃষ্ঠার। সেখানে তিনি সব দায় মাথায় নিলেও বিদায়বেলায় ‘দেশদ্রোহী’ ইস্যুকে ভোলেননি। বলেছেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলন থেকে যাতে দেশদ্রোহীরা সুযোগ নিতে না পারে, সেই কারণেই দেশকে রক্ষা করতে পদত্যাগ করলাম।’ পাশাপাশি সরকার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসে কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যও দিয়েছেন।
পাঁচ বছরের ব্যবধানে দু’বার আন্দোলনের সামনে নতি স্বীকার করল মোদি সরকার। ২০২১ সালে দীর্ঘ আন্দোলনের পর কেন্দ্র তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। আর এবার ২০২৬ সালে ছাত্র-যুবর কাছে ফের পিছু হটল কেন্দ্র। মোদি সরকার সাম্প্রতিককালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও আনন্দমঠকে ভারতের চালিকাশক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। যুবশক্তির এই জয়ে আনন্দমঠের একটি বিখ্যাত গানকে আজও সত্য প্রমাণিত হতে দেখলেন নরেন্দ্র মোদি। গানটি ছিল, ‘এ যৌবনজলতরঙ্গ রোধিবে কে’! ভারতের যুবজোয়ারকে সত্যিই রুখে দেওয়া গেল না।