


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দেশের যুবসমাজের একাংশকে কটাক্ষ করে আরশোলার তকমা দিয়েছিলেন। সেই একটি শব্দই রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল বিজেপি তথা মোদি সরকারের জন্য। ১২ বছরের সর্বশক্তিমান ভাবমূর্তি ভেঙে জেন-জিরা নিজেদের ককরোচ আখ্যা দিয়ে ভারতে এক নতুন প্রতিবাদ তরঙ্গের জন্ম দিয়েছে। তাদের চাপে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে কেন্দ্রকে। সেই ককরোচ-ঢেউয়ের মধ্যেই আফটারশক তৈরি করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্বাধীনতা দিবসের লালকেল্লা-ভাষণে তাঁর সরকারের বিরোধিতাকে ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দিয়ে। ওই শব্দবন্ধকে হাতিয়ার করেই ফের উঠে গিয়েছে তীব্র সরকার বিরোধী হাওয়া। আরশোলার পর দিমাগি নকশাল, অর্থাৎ শিক্ষিত সমাজের জোড়া ফলা। বিরোধী দল থেকে সোস্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্ম—সর্বত্র। কখনো প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম আবার কখনো অরবিন্দ কেজরিওয়াল—তাঁরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছেন, ‘আমি গর্বিত দিমাগি নকশাল।’ বিরোধীদের কটাক্ষ, আরবান থেকে দিমাগি নকশাল। সরকারকে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্ন করার প্রবণতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এত আপত্তি কেন? একের পর এক আক্রমণ, লাগাতার আক্রমণাত্মক তকমা কেন? সরকার বনাম বিরোধীদের নিত্য সংঘাতে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকছে না এই ইস্যু। ককরোচের ধাঁচে এবার রাতারাতি তৈরি হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন অ্যাকাউন্ট—দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি। ঠিক ককরোচ জনতা পার্টির মতো। সোমবার মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এই ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার দু’লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এক্স হ্যান্ডলেও একই নামে হয়েছে অ্যাকাউন্ট। সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সোমবার ওই অ্যাকাউন্টের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে—তাদের দিমাগি নকশাল জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা দেখে সরকার ভয় পেয়েছে। কারণ, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে অদৃশ্য কোনো শক্তির নির্দেশে। সেই অ্যাকাউন্ট পরে আবার ফিরেছে। এবং ফিরতেই ফলোয়ার আড়াই লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে। তারপর ফের বন্ধ। ততক্ষণে অবশ্য নতুন একটি অ্যাকাউন্টও ‘দিমাগি নকশাল’রা বানিয়ে ফেলেছে—অল ইন্ডিয়া দিমাগি নকশাল জনতা পার্টি নামে। তারপর এমনই একের পর এক অ্যাকাউন্ট। ককরোচ জনতা পার্টির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধাচারণ এবং জনতার কাছে পৌঁছানো—সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্রোহ ও ক্যাম্পেন নতুন এক প্রবণতার জন্ম দিয়েছে।
‘দিমাগি নকশাল’ তকমায় যে বিজেপি বিস্তর চাপে পড়েছে, তার প্রমাণ মিলেছিল রবিবারই। দেশবাসীর কাছে যাতে ‘ভুল বার্তা’ না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে আসরে নেমে পড়ে কেন্দ্র। ড্যামেজ কন্ট্রোলে কেন্দ্রীয় সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর বার্তা ছিল, ‘প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের উদ্দেশে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি। তিনি তাদের কথা বলতে চেয়েছেন, যারা মূলত দেশবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকে।’ উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, যেমন ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির বিরোধিতা। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও পালটা আক্রমণের পথে হেঁটে বলেন, ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, চিদম্বরম বলেছেন তিনি দিমাগি নকশাল। সরকারের উচিত তদন্ত করা।’ সুধাংশু ত্রিবেদীও ছিল এক সুর—‘প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই নকশাল! অত্যন্ত উদ্বেগের ব্যাপার!’ বিজেপি এমপি ব্রিজ লাল বলেন, ‘শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী সমাজের কিছু মানুষের হাতে হয়তো অস্ত্র নেই। কিন্তু এই শ্রেণির মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা নকশালের থেকেও বিপজ্জনক। দিমাগ অর্থাৎ মস্তিষ্ক।’ প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষিত সমাজের প্রশ্ন করা নিয়ে হঠাৎ এত কেন চিন্তিত মোদি সরকার? আপত্তি কীসে? মস্তিষ্কে?