


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: অহং-এর পতন! দেশজুড়ে অপারেশন লোটাস চালিয়ে একের পর এক আঞ্চলিক দলকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার মিশন নেওয়া বিজেপি ধরাশায়ী বিহারে। তাও মাত্র দেড় বছর আগে জন্ম নেওয়া একটি আঞ্চলিক দলের কাছে। জেন জি আন্দোলনের পর প্রথম সংসদীয় নির্বাচনের পরীক্ষায় নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের দল ব্যর্থ। বিহারের যে কেন্দ্রে মাত্র ৮ মাস আগে ৫২ হাজার ভোটে বিপুল জয় এসেছিল, সেই বাঁকিপুর বিধানসভায় মুখ থুবড়ে পড়ল শাসক বিজেপি। ভোট স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোর জীবনের প্রথম নির্বাচন লড়তে নেমেই জায়ান্ট কিলার। নিজের প্রতিষ্ঠিত জন সুরাজ পার্টির প্রার্থী হিসাবে তিনি বিজেপিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন পাটনা শহরের এই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে। ১৯৯৫ সাল থেকে বাঁকিপুর বিজেপির দখলে। এই পরাজয় তাদের কাছে দ্বিগুণ ধাক্কা। কারণ? প্রথমত, নতুন মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী খাস পাটনাতেই দলের হার প্রতিরোধে ব্যর্থ। আর দ্বিতীয়ত, বাঁকিপুর হল বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের দুর্গ। এই কেন্দ্র থেকেই তিনি লাগাতার পাঁচবার জয়ী। আর তার আগে ১৯৯৫ সাল থেকে বিধায়ক ছিলেন তাঁর পিতা (তৎকালীন পাটনা পশ্চিম কেন্দ্র)। সুতরাং বিজেপির তো বটেই, এই কেন্দ্র ছিল তাঁর পারিবারিক গড়। খোদ দলের সর্বভারতীয় সভাপতির ফেলে আসা আসনেই বিজেপিকে পরাজয়ের স্বাদ নিতে হচ্ছে—এই ঘটনা চরম অস্বস্তিকর বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ধস নামল জেন জি আন্দোলনের ঝড়ের মধ্যেই। নজর করার বিষয় হল, বাঁকিপুর হল পাটনার এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা সর্বাধিক। ১ লক্ষ ২০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ জেন জি যে রাজনীতিগতভাবেও মুখ ফেরাচ্ছে বিজেপির দিক থেকে, সেই বার্তা স্পষ্ট। ৪৪ শতাংশ ভোট বেড়েছে পিকে’র দলের। শুধু বিজেপিরই প্রায় ২৫ হাজার ভোট স্যুইং হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের পক্ষে সওয়াল তোলা প্রশান্ত কিশোর ভাগ বসিয়েছেন আরজেডির ভোটব্যাংকেও। এর প্রধান কারণ কি জেন জি আন্দোলনে তেজস্বী যাদবের অনুপস্থিতি? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে।
একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে বিস্মিত করে বিহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া বিধানসভা কেন্দ্রেও ধরাশায়ী মোদির দল। আসন ধরে রেখেছে কংগ্রেস। তিন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিধানসভা ভোটের উপনির্বাচন। মুখরক্ষা করল একমাত্র গুজরাত। এই রাজ্যের মঞ্জালপুরে বিজেপি জয়ী হয়েছে কংগ্রেসকে হারিয়ে। নিট থেকে রামমন্দিরে প্রণামি চুরি। একাধিক ইস্যুতে সরকার কোণঠাসা। তারই মধ্যে এভাবে বিহার ও মধ্যপ্রদেশ থেকে পরাজয়ের সংবাদ আসায় নৈতিকভাবে আরও ব্যাকফুটে মোদি সরকার। উপনির্বাচনে সচরাচর জয়ী হয় শাসক দল। সেই প্রবণতার বিপরীত ফলাফল। এসআইআর পরবর্তী ভোটে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই বিহারেই বিরোধীদের উড়িয়ে দিয়েছিল বিজেপি। সেখানে ৮ মাসের মধ্যে কী এমন হল?
প্রশান্ত কিশোরের এই সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লালুপ্রসাদ যাদব, নীতীশ কুমার, রামবিলাস পাসোয়ানের পর আবার এক নেতা একক দল গঠন করে বিহারের রাজনীতির আঙিনায় সাফল্যের সূচনা করলেন। এই ফলাফল বিহার রাজনীতির সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায়। লালুপ্রসাদ যাদব ও তেজস্বী যাদবের ভোটব্যাংক মূলত যাদব ও মুসলিম। নীতীশ কুমারের কুর্মি ও কৈরী। প্রয়াত রামবিলাস পাসোয়ানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পুত্র চিরাগের লক্ষ্য পাসোয়ান সম্প্রদায়। আর বিজেপির রাজনীতির ভরকেন্দ্র? মূলত হিন্দুত্ব। এসব থেকে শতহস্ত দূরে থেকে এই প্রথম প্রশান্ত কিশোর জাতপাতের সমীকরণ ছাড়াই একটি হাই ভোল্টেজ ভোটে বিহারে সাফল্য পেলেন। তাঁর দলের প্রতীক স্কুলব্যাগ! শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যন্তরমন্তর থেকে পাটনা হয়ে শিয়ালদহ, উঠল গর্জন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। জাতপাত ছাড়াই শুধু শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ইস্যুতে প্রশান্ত কিশোর বিহারে জিতে বললেন, ‘৩০ বছরের গড় ৩০ দিনে ভেঙে দিয়েছি’। শক্তিহীন কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশে বিজেপিকে হারিয়ে দিচ্ছে। ভারতের রাজনীতির কি দিশাবদল ঘটছে?