


সংবাদদাতা, রামপুরহাট : এখানে মা লক্ষ্মীর পাশাপাশি পুজো পান স্বর্গের অপ্সরা ‘ছায়া’ ও ‘ছবি’। লক্ষ্মীর সই জয়া ও বিজয়াকে মান্যতা দিয়েই এই দুই দেবীমূর্তি থাকে এখানে। ধনদেবীর আরাধনার সঙ্গে থাকে জমজমাট মেলা। দুর্গাপুজো নয়, ঝাড়খণ্ড ও মুর্শিদাবাদ সীমানা লাগোয়া মুরারইয়ের গোঁড়শা গ্রামের মূল উৎসব কিন্তু এই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। লোক সংস্কৃতির অনন্য চর্চার জন্যই এই পুজোর খ্যাতি দূরদূরান্তে ছড়িয়েছে। প্রায় আড়াইশো বছরের পুরানো এই দুই লক্ষ্মীপ্রতিমা ও উৎসব আজ বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের মানুষকে যেন এক সুতোয় বেঁধেছে।
একদিকে ঝাড়খণ্ডের পিরলিপুর ও গৌরীপুর, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের কাশিমনগর ও বহুতালের ঠিক মাঝখানে গোঁড়শা গ্রাম। প্রাচীন এই জনপদে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে বাস করে। গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ায় বহু বছর ধরে দু’টি লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে। বিশেষত্ব হল, দুই পাড়ারই লক্ষ্মীপ্রতিমার দু’পাশে থাকে ‘ছায়া’ ও ‘ছবি’র মৃন্ময়ী মূর্তি।
গ্রামে সিংহবাহিনী তলা থাকলেও এখানে দুর্গাপ্রতিমা গড়ে পুজো হয় না। তবে দুই পাড়ায় মা লক্ষ্মীর স্থায়ী পাকা মন্দির রয়েছে। পুজোর সুব্যবস্থার জন্য রয়েছে আলাদা জমিও। গ্রামে ‘লক্ষ্মী’ নামে একটি বড়ো পুকুর রয়েছে, যেখানে ফি-বছর হয় মাছের চাষ। চৈত্র মাসে সেই পুকুরের মাছ বিক্রি এবং জমির ধান বিক্রির টাকা দুই পাড়ার লক্ষ্মীপুজো কমিটির মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়। গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এই পুজো পরিচালনায় সহযোগিতা করেন।
পূর্বপাড়ার পুজোর সম্পাদক তন্ময় দাঁ জানান, তাঁরা এবার কবিগানের আসর বসাবেন। অন্যদিকে, পশ্চিমপাড়ার পুজোর অন্যতম সদস্য প্রেমানন্দ পালের কথায়, তাঁদের পাড়ায় বাউল শিল্পীদের নিয়ে রাতভর গানের আসর চলবে।
এই গ্রামে এসে বোঝার উপায় থাকে না কোনটি বাংলা আর কোনটি ঝাড়খণ্ড। লক্ষ্মীপুজোর রাতে ঝাড়খণ্ড ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এসে মাকে ভোগ নিবেদন করে পুজো দেন। পরের দিন মধ্যরাতে দুই পাড়ার মানুষ প্রতিমা কাঁধে নিয়ে হরেক রকমের বাজনা সহযোগে সারা রাত ধরে গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই শোভাযাত্রায় জেনারেটরের আলোর কৃত্রিমতা থাকে না। বড়ো বড়ো আতসবাজির রোশনাইয়েই আলোকিত হয় দুই দেবীর নিরঞ্জনের পথ। ভোরে চাঁদের আলো ফিকে হয়ে আসার পর পৌঁছায় গ্রামের হাঁড়ি পুকুর পাড়ে। সেখানে দুই দেবীকে নামিয়ে চলে আতসবাজি পোড়ানোর প্রতিযোগিতা। আর তার পরেই হয় প্রতিমার নিরঞ্জন।
পুজো উদ্যোক্তারা জানান, ‘ছায়া’ ও ‘ছবি’ নামে পুজিত এই দেবী মূর্তি আসলে লক্ষ্মীর দুই সই জয়া ও বিজয়া। অতীতে এই গ্রামে দুর্গাপুজোর চল ছিল না। এই গ্রামের আসল প্রাণস্পন্দন এখনও কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোই। সব মিলিয়ে, গোঁড়শার এই লক্ষ্মীপুজো আজও বিভেদের সীমানা পেরিয়ে সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনক্ষেত্র হিসেবে সুপরিচিত।