


শিলং: ‘আমরা পাহাড়ে হেঁটে হেঁটে বড্ড ক্লান্ত। খুন করতে পারব না। মাত্র চার লক্ষ টাকার জন্য তো নয়ই!’ শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেছিল তিন সুপারি কিলার। প্ল্যান ভেস্তে যেতে দেখে চিৎকার করে ওঠে সোনম রঘুবংশী। ‘ওকে মারতেই হবে। ২০ লাখ টাকা দেব!’
বিয়ের মাত্র তিনদিনের মাথাতেই সোনম বানিয়ে ফেলেছিল স্বামী রাজা রঘুবংশীকে খুনের ‘ফুলপ্রুফ প্ল্যান’। প্রেমিক রাজ কুশওয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাজানো হয় লুটপাটের বাহানায় হত্যার সেই ছক। ১৪ মে, বিয়ের তিনদিন পর সোনমের সঙ্গে অভিযুক্ত প্রেমিক রাজ কুশওয়ার একটি চ্যাট সামনে এসেছে। তাতে সোনম জানায়, ‘বিয়ের আগে থেকেই রাজাকে কাছে ঘেঁষতে দিইনি।’ তদন্তকারীরা বলছেন, সেইদিনই স্বামীকে খুনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল সে। হানিমুনের জন্য শিলংকে বেছে নেওয়া সেই কারণেই। জানা যাচ্ছে, হানিমুন রওনা হওয়ার চারদিন আগে, ১৬ মে রাত ৯টা নাগাদ প্রেমিক রাজকে ফোন করেছিল সোনম। রাত তিনটে পর্যন্ত চলেছিল সেই ফোনালাপ। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে রাজাকে খুনের ব্লু প্রিন্ট নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন, ১৭ মে ছেলেবেলার তিন বন্ধু আকাশ রাজপুত, বিশাল চৌহান এবং আনন্দ কুর্মির সঙ্গে ইন্দোরের সুপার করিডর কাফেতে বসে রাজ। সেখানেই রাজাকে খুনের জন্য চার লক্ষ টাকায় রফা হয়। সুপারি কিলারদের ৫০ হাজার টাকা, নতুন অ্যান্ড্রয়েড ফোন, একটি কিপ্যাড ফোন আর নতুন সিম সব দিয়েছিল রাজ। সঙ্গে বিমানের টিকিট। এরপরই সোনমরা গুয়াহাটি হয়ে শিলংয়ের দিকে যাত্রা করে।
তদন্তকারিরা জানাচ্ছেন, ২৩ মে চেরাপুঞ্জিতে স্কুটার রেখে জলপ্রপাত দেখতে পাহাড়ি পথে রওনা হয় রাজা-সোনম। অনুসরণ করে বিশাল-আনন্দ। স্কুটারের কাছে নজরদারিতে ছিল আকাশ। দুপুর দেড়টা নাগাদ খাড়াই পাহাড়ে একটি নির্জন জায়গায় এসেই ক্লান্তির অজুহাতে একটু পিছিয়ে পড়ে সোনম। তারপর সুপারি কিলারদের খুনের নির্দেশ দেয়। কিন্তু বিস্তর হাঁটাহাঁটির পর বেঁকে বসে বিশালরা। অন্তিম সময়ে প্ল্যান ভেস্তে যেতে দেখে পাহাড়ি পায়ে চলা রাস্তায় মাথা ঠিক রাখতে পারেনি সোনম। রাজার ব্যাগ ছিল তার কাছে। সেখান থেকে ১৫ হাজার টাকা বের করে বিশালদের হাতে দিয়েই চিৎকার করে ওঠে সোনম, ‘ওকে মারতেই হবে। ২০ লাখ টাকা দেব!’ স্ত্রীর চিৎকার শুনে রাজা ঘুরে দাঁড়ায়। প্রশ্ন করে, ‘কী হল?’ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাথা লক্ষ্য করে কুড়ুল চালায় বিশাল। আনন্দ পিছন থেকে আঘাত করে রাজাকে। এরপর স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেয় স্বয়ং সোনম। তখনও রাজা জীবিত। এরপর নিজের ফোন ভেঙে ফেলে সোনম। সেখান থেকে সোজা গুয়াহাটি ফিরে এসে ট্রেনে শিলিগুড়ি হয়ে ইন্দোর রওনা হয়।
অভিযুক্তদের জেরা করে এমনই তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজাকে দু’বার আঘাত করা হয়েছিল। একবার মাথার সামনে, আর একবার পিছনের দিকে। রবিবার মধ্যরাতে গাজিপুরে আত্মসমর্পণ করেন সোনম। আকাশকে ললিতপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। ইন্দোর থেকে পাকড়াও করা হয়ে রাজ, বিশাল ও আনন্দকে। সোনমকে তিনদিনের ট্রানজিট রিমান্ডে মঙ্গলবারই শিলং নিয়ে গিয়েছে মেঘালয় পুলিসের টিম।
সূত্রের খবর, বাড়ির চাপে রাজাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন সোনম। প্রথম থেকেই নিজের অপছন্দের কথা স্বামীকে হাবেভাবে বুঝিয়েও দিয়েছিল। বিষয়টি আঁচ করে মা উমা রঘুবংশীকে জানিয়েছিলেন রাজা। সন্তানহারা মায়ের দাবি, সেদিন ছেলের কথাকে গুরুত্ব দিলে আজ এই পরিণতি দেখতে হতো না।