


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: নিয়মিত রেশন তুলছেন। বিনামূল্যে পাচ্ছেন চাল-গম। কিন্তু আপনি এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য তো? আপনার কাছে যে রেশন কার্ড আছে, সেই কার্ডে আদৌ কি রেশন পাওয়ার কথা? এসবই এবার যাচাই করবে আয়কর দপ্তর। তার জন্য ইতিমধ্যে পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। আয়কর কর্তাদের বক্তব্য, যাঁরা বেশি আয় করেও গরিবদের জন্য প্রযোজ্য রেশনিং ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে গোটা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে নতুন করে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের বাতাবরণ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা ওয়াকিবহাল মহলের। কারণ, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, একটা বড় অংশের রেশন গ্রাহককে ছেঁটে ফেলতে চাইছে তারা। রেশন গ্রাহকদের ভর্তুকির টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠাবে কেন্দ্র—এমন জল্পনায় ইতিমধ্যে জলঘোলা শুরু হয়েছে। এই আবহে আয়কর দপ্তরের তোড়জোড় বিতর্কের নয়া পরিসর তৈরি করল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনা পরবর্তী সময়ে দেশবাসীর একটা বড় অংশকে বিনা পয়সায় খাদ্যশস্য দিতে ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা’ প্রকল্প এনেছিল কেন্দ্র। ২০২৮ সাল পর্যন্ত এই পরিষেবা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা হয়েছে আগেই। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পান। তাঁদের একটা বড় অংশ ‘অন্নপূর্ণা অন্ত্যোদয় যোজনা’র আওতায় পরিবার পিছু মাসে চাল-আটা বা গম মিলিয়ে ৩৫ কেজি খাদ্যশস্য পান। বাকিরা পান মাথা পিছু পাঁচ কেজি করে। কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, বিভিন্ন রাজ্যে খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় থাকা প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদের মধ্যে ‘জল’ রয়েছে। অর্থাৎ যাঁদের বিনামূল্যে রেশনের প্রয়োজন নেই, তাঁরাও এই সুবিধা নিয়ে থাকেন। অথচ ভর্তুকি বাবদ বিপুল অর্থ খরচ করতে হচ্ছে কেন্দ্রকে। এই অবস্থায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা’ খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছে ২ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকা। তারপরও সরকার চাইছে, ভর্তুকির খরচ সার্বিকভাবে কিছুটা কম হোক। তাহলে তা অন্য খাতে ব্যবহার করা হবে। কারণ, আগামী অর্থবর্ষ থেকে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত রোজগারে আয়কর ছাড়ের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তার ফলে রাজস্ব কমবে কেন্দ্রের। অথচ, মোদি সরকারের আয়ের সংস্থান বাড়ছে না। উৎপাদন ক্ষেত্রে সাড়া নেই। তাহলে উপায় একটাই, ফাঁক ভরাট করতে হবে। কেন্দ্রের যুক্তি হল, যদি বিপুল সংখ্যক মানুষকে আয়কর ছাড়ের সুবিধা দিতেই হয়, তাহলে তাদের বিনামূল্যে রেশনের সুবিধা দেব কেন? এই শ্রেণির চাকরিজীবী তো বটেই, রিটার্ন জমা করা বহু মানুষও এই সুবিধা নিয়ে থাকেন। সেখানেই কাটছাঁট করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার।
সূত্রের খবর, আয়কর সংক্রান্ত তথ্য ক্রেতাসুরক্ষা মন্ত্রককে জানানোর জন্য ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস’ তাদের ‘সিস্টেম’ বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রকের অধীন খাদ্য ও গণবন্টন বিভাগের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার অফিসারকে সেই তথ্য দিতে হবে। ক্রেতাসুরক্ষা মন্ত্রকই রেশন গ্রাহকদের আধার সংক্রান্ত তথ্য জানাবে আয়কর দপ্তরকে। আধারের সঙ্গে ইতিমধ্যে রেশন কার্ডের ‘লিঙ্ক’ হয়েছে। এরপর আধারের সঙ্গে প্যানের ‘লিঙ্ক’ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বার্ষিক আয় জানা যাবে। আয়কর বিভাগ ও গণবণ্টন দপ্তর নিজেরাই ঠিক করবে, কতজন ব্যক্তির তথ্য তারা লেনদেন করবে। তথ্যগুলি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তার যথাযথ সুরক্ষা দরকার। তাই কীভাবে তা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেই মতো পরিকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় রাজ্যগুলি কী অবস্থান নেয়, সেটাই এখন দেখার। পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যদপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ে কেন্দ্র এখনও কোনও আলোচনা করেনি বলেই খবর।